একপাশে মসজিদে আজান ও পাঁচ ওয়াক্তের নামাজ, অন্যদিকে মন্দিরে দুর্গাপূজার আলোকসজ্জা ও উপাসনা। আজান ও নামাজের নির্ধারিত সময়ে শ্রদ্ধার সঙ্গে বন্ধ থাকে ঢাকঢোলের শব্দ, আবার নামাজ শেষেই নিয়মিত বিরতিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবে শুরু হয় পূজার অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা। এভাবেই দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা ও পারস্পরিক বিশ্বাসের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে আসছে টাঙ্গাইলের নাগরপুর উপজেলা সদরের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়ি।
প্রতিবছরের ধারাবাহিকতায় এবারও চৌধুরী বাড়ির আঙিনায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসব। পূজামণ্ডপে প্রতিদিন হাজারো দর্শনার্থীদের ভিড় জমলেও পাশাপাশি অবস্থিত নাগরপুর চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে মুসল্লিরা নিরবচ্ছিন্নভাবে প্রতিদিনের নামাজ আদায় করছেন। দুই ভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব ও সহযোগিতায় পুরো উৎসবের পরিবেশ অত্যন্ত শান্তিপূর্ণ। সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে স্থানীয় প্রশাসন থেকেও গ্রহণ করা হয়েছে নিচ্ছিন্দ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, নাগরপুরের ঐতিহ্যবাহী চৌধুরী বাড়িতে ১৯৩২ সালে প্রতিষ্ঠা পায় ‘উঝা ঠাকুর কেন্দ্রীয় দুর্গা মন্দির’। পরবর্তীকালে ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চৌধুরী বাড়ি ক্লাবের উদ্যোগে প্রতিবছর বর্ণাঢ্য আয়োজনে দুর্গোৎসব শুরু হয়। এর কয়েক বছর পরই ১৯৭২ সালে একই আঙিনায় গড়ে ওঠে চৌধুরী বাড়ি কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। এরপর থেকেই যুগ যুগ ধরে একই আঙিনায় পাশাপাশি পালিত হয়ে আসছে দুই ধর্মের প্রার্থনামূলক কার্যক্রম।
স্থানীয় পূজারী ও ক্লাবের সভাপতি লিটন পোদ্দার জানান, দীর্ঘদিন ধরে এই আঙিনায় দুর্গাপূজা হলেও আজ পর্যন্ত কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পূজার আয়োজনে সর্বাত্মক সহযোগিতা করে থাকেন, তেমনি আজান ও নামাজের সময় পূজার সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করে বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। মসজিদের ইমামও এই সম্প্রীতির ভূয়সী প্রশংসা করে জানান, দীর্ঘদিনের বোঝাপড়া ও সহযোগিতার কারণে দুই পক্ষের মধ্যে পারস্পরিক বন্ধন অত্যন্ত দৃঢ়।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিখন বনিক এবং স্থানীয় প্রতিনিধিরা চৌধুরী বাড়ির এই ঐতিহাসিক মেলবন্ধনকে বাংলাদেশের বহুমাত্রিক সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল আলোকবর্তিকা বলে অভিহিত করেছেন। ভেদাভেদ ভুলে ধর্মীয় সম্প্রীতি ও শ্রদ্ধাবোধের এই চিরন্তন ঐতিহ্য ভবিষ্যতেও অটুট থাকবে বলে মনে করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
Leave a comment