নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া সর্বশেষ হলফনামা বিশ্লেষণে উঠে এসেছে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দেওয়া এক তথ্য। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের তুলনায় বেশি। যদিও বার্ষিক আয়ের দিক থেকে নাহিদ ইসলাম এগিয়ে, তবে মোট সম্পদের পরিমাণ বিবেচনায় বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ এই দুই নেতা তুলনামূলকভাবে বেশি সম্পদের মালিক।
নির্বাচনী হলফনামা অনুযায়ী, নাহিদ ইসলামের বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা। একই নথিতে তারেক রহমানের বার্ষিক আয় দেখানো হয়েছে ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা এবং জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমানের বার্ষিক আয় ৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা। এই পরিসংখ্যান রাজনীতিতে আয়ের স্বচ্ছতা ও নেতাদের আর্থিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে আলোচনা সৃষ্টি করেছে।
হলফনামা অনুযায়ী নাহিদ ইসলাম পেশাগতভাবে শিক্ষকতা ও পরামর্শক হিসেবে যুক্ত রয়েছেন। এই দুই খাত থেকে তার বার্ষিক আয় ১৬ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় তার আয়ে বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায়—গত বছর তার আয় ছিল ১৩ লাখ ৫ হাজার ১৫৮ টাকা।
সম্পদের বিবরণে দেখা যায়, নাহিদ ইসলামের কাছে নগদ অর্থ রয়েছে ১৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা। তার স্ত্রীর কাছে রয়েছে নগদ ২ লাখ টাকা। ব্যাংকে জমাকৃত অর্থের পরিমাণ ৩ লাখ ৮৫ হাজার ৩৬৩ টাকা ৫৭ পয়সা। অলংকারের ক্ষেত্রেও তার ব্যক্তিগত মালিকানায় থাকা স্বর্ণালংকারের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭ লাখ ৭৫ হাজার টাকা, আর তার স্ত্রীর অলংকারের মূল্য ১০ লাখ টাকা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ইলেকট্রনিক সামগ্রী ও আসবাবপত্র মিলিয়ে তার সম্পদের পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
সব মিলিয়ে নাহিদ ইসলামের ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩২ লাখ ১৬ হাজার ১২২ টাকা। হলফনামায় উল্লেখ করা হয়েছে, তার কোনো ব্যক্তিগত দায় নেই, যদিও ব্যাংকে তার নামে ঋণ রয়েছে। এই তথ্য নাহিদ ইসলামের আর্থিক অবস্থার একটি তুলনামূলক স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হলফনামা অনুযায়ী তার বার্ষিক আয় ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৩৫৩ টাকা। যদিও আয়ের অঙ্ক তুলনামূলকভাবে কম, তবে সম্পদের পরিমাণের দিক থেকে তিনি উল্লেখযোগ্যভাবে এগিয়ে।
হলফনামায় দেখা যায়, তারেক রহমানের কাছে নগদ অর্থ রয়েছে ৩১ লাখ ৫৮ হাজার ৪২৮ টাকা। শেয়ার বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তার অবস্থান শক্ত—তার নামে রয়েছে ৫ লাখ টাকার শেয়ার এবং বিভিন্ন কোম্পানিতে বিনিয়োগ করা শেয়ারের মূল্য ৪৫ লাখ টাকা। এছাড়া কোম্পানির নামে দেখানো সম্পদের পরিমাণ ১৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা।
তারেক রহমানের ব্যাংকিং সম্পদের একটি বড় অংশ রয়েছে ফিক্সড ডিপোজিট রিসিপ্টে (এফডিআর)। হলফনামা অনুযায়ী, তার এফডিআরে জমা অর্থের পরিমাণ ৯০ লাখ ২৪ হাজার ৩০৭ টাকা। আসবাবপত্র, জমি এবং অন্যান্য স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ মিলিয়ে তার ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ১৮৫ টাকা।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান পেশায় একজন চিকিৎসক। তার হলফনামা অনুযায়ী, কৃষিখাত থেকে তার বার্ষিক আয় ৩ লাখ টাকা। আয়ের দিক থেকে তিনি এই তিন নেতার মধ্যে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকলেও সম্পদের দিক থেকে তার অবস্থান মাঝামাঝি।
হলফনামা অনুযায়ী, ডা. শফিকুর রহমানের নামে ১১ দশমিক ৭৭ শতক জমির ওপর একটি ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ২৭ লাখ টাকা। এছাড়া তার মালিকানায় রয়েছে ২ লাখ টাকার ইলেকট্রনিক সামগ্রী। বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার ও বিনিয়োগ মিলিয়ে তার আর্থিক বিনিয়োগের পরিমাণ ২৭ লাখ ১৬ হাজার ৮৮০ টাকা।
কৃষিজ সম্পদের দিক থেকেও তার উল্লেখযোগ্য মালিকানা রয়েছে। তার নামে ২ একর ১৭ শতক কৃষিজমি রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ১৭ লাখ ৭১ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে তার ঘোষিত মোট সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৪৭ লাখ ২৫ হাজার ৮৩৪ টাকা।
এই তিন রাজনৈতিক নেতার হলফনামা বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়, বার্ষিক আয়ের দিক থেকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এগিয়ে থাকলেও দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও বিনিয়োগের কারণে মোট সম্পদের পরিমাণে বিএনপি ও জামায়াতের শীর্ষ নেতারা তুলনামূলকভাবে এগিয়ে রয়েছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নির্বাচনী হলফনামা রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এতে শুধু প্রার্থীর আর্থিক অবস্থানই নয়, বরং সময়ের সঙ্গে আয়-সম্পদের পরিবর্তনের চিত্রও স্পষ্ট হয়। নাহিদ ইসলামের ক্ষেত্রে বার্ষিক আয়ের বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক কম সম্পদ তার পেশাগত আয়ের ওপর নির্ভরশীলতা নির্দেশ করে। অন্যদিকে তারেক রহমান ও ডা. শফিকুর রহমানের ক্ষেত্রে বিনিয়োগ ও স্থাবর সম্পদের পরিমাণ দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক পরিকল্পনার প্রতিফলন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনী হলফনামার এই তথ্যগুলো আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ভোটারদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে। আয় ও সম্পদের স্বচ্ছ প্রকাশ রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতে কতটা ভূমিকা রাখে—সে প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে এখন রাজনৈতিক অঙ্গন ও জনমনে চলছে বিস্তর আলোচনা।
Leave a comment