জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেছেন, প্রকৃত চাঁদাবাজি আড়াল করতেই জুলাই যোদ্ধাদের অন্যায়ভাবে হয়রানি করা হচ্ছে। তার দাবি, ৫ আগস্টের পর কারা চাঁদাবাজিতে জড়িত—তা জাতির কাছে পরিষ্কার। সোমবার দিনগত রাত সোয়া ২টার দিকে টঙ্গীতে কারামুক্ত জুলাই যোদ্ধা তাহরিমা জান্নাত সুরভীর বাসায় গিয়ে সুরভী ও তার পরিবারের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে যেসব অভিযোগ ও আইনি পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে, সেগুলোর লক্ষ্য প্রকৃত অপরাধীদের বিচারের মুখোমুখি করা নয়; বরং রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় কিছু তরুণকে হয়রানি করা। তার ভাষ্য, “প্রকৃত চাঁদাবাজদের আড়াল করতেই জুলাই যোদ্ধাদের টার্গেট করা হচ্ছে। এতে ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন হচ্ছে।”
এ সময় তিনি গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা করেন। নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে একটি নির্দিষ্ট দলের পক্ষে কাজ করে কিছু গণমাধ্যম নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, “নির্বাচনের আগে মিডিয়া যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়।” একই সঙ্গে তিনি সাংবাদিকদের পেশাগত নিরপেক্ষতা বজায় রাখার আহ্বান জানান। বক্তব্যের সময় এনসিপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের একাধিক নেতা উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে চাঁদাবাজির একটি মামলায় জামিনে মুক্তি পান ‘জুলাই যোদ্ধা’ তাহরিমা জান্নাত সুরভী। সোমবার রাত সোয়া ৮টার দিকে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্ত হন তিনি। ওই দিন সন্ধ্যা সোয়া ৬টার দিকে অতিরিক্ত জেলা দায়রা জজ-১-এর বিচারক অমিত কুমার দে তার চার সপ্তাহের জামিন মঞ্জুর করেন।
তবে এর আগে একই দিনে দুপুর ১টার দিকে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-২-এর বিচারক সৈয়দ ফজলুল মহাদি সুরভীর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড আদেশের পর আদালত প্রাঙ্গণে ‘ছাত্র-শ্রমিক-জনতা’র ব্যানারে বিক্ষোভ হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রিমান্ড আদেশ ঘোষণার পর আদালত চত্বরে উত্তেজনা তৈরি হয় এবং বিক্ষোভকারীরা আদেশের বিরোধিতা করেন।
রিমান্ড আদেশের পর গারদখানা থেকে প্রিজন ভ্যানে তোলার সময় সুরভী উচ্চস্বরে অভিযোগ করে বলেন, “তদন্ত ছাড়া আমারে রিমান্ড দিছে। ম্যাজিস্ট্রেট কোর্টে কোনো তদন্ত রিপোর্ট দেওয়া হয়নি। কোনো রকম তদন্ত ছাড়াই আমারে রিমান্ড দিছে।” তার এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।
বিশেষ করে সুরভীর বয়স ১৭ বছর হওয়ায় রিমান্ড আদেশ নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মে প্রশ্ন ওঠে। সামাজিক মাধ্যমে অনেকেই অপ্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়ে কঠোরতার দাবি জানান এবং দ্রুত প্রতিকার চাওয়ার আহ্বান জানান।
বিষয়টি নজরে আসার পর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টে লেখেন, “সুরভীর বিষয়ে খোঁজ নিয়েছি। ইনশাআল্লাহ সে দ্রুত প্রতিকার পাবে।” ওই পোস্টের পরপরই জামিন প্রক্রিয়া এগোয় এবং সন্ধ্যায় আদালত থেকে জামিন মঞ্জুর হয়।
জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর রাতে সুরভী টঙ্গীর বাসায় ফেরেন। খবর পেয়ে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সেখানে গিয়ে পরিবারের খোঁজখবর নেন এবং তাদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় তিনি সুরভী ও তার পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন।
আইনজীবীরা বলছেন, মামলার তদন্ত ও রিমান্ডের ক্ষেত্রে প্রক্রিয়াগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে বয়স ও অভিযোগের প্রকৃতি বিবেচনায় আদালতের সতর্কতা প্রয়োজন—এমন মন্তব্য করেন তারা। অন্যদিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ীই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ঘটনা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনীতি ও আইনশৃঙ্খলার সংবেদনশীল যোগসূত্রকে সামনে এনেছে। একদিকে রাজনৈতিক দলগুলো হয়রানির অভিযোগ তুলছে, অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলছে। ফলে আস্থার সংকট তৈরি হচ্ছে, যা নিরপেক্ষ নির্বাচন ও গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য চ্যালেঞ্জ হতে পারে।
এ প্রেক্ষাপটে নাহিদ ইসলামের বক্তব্য ও সুরভীর জামিন—দুটি ঘটনাই জাতীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে। সামনে তদন্তের অগ্রগতি ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির গতিপথই নির্ধারণ করবে, এই বিতর্ক কোন দিকে মোড় নেয়।
Leave a comment