রাজধানীর কল্যাণপুরের বহুল আলোচিত ‘জাহাজবাড়ি’ অভিযানে ৯ তরুণ নিহত হওয়ার ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ মোট ৮ জনের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ জানুয়ারি) সকালে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১-এ প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়।
ট্রাইব্যুনাল সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগপত্রে তৎকালীন সরকারের উচ্চপর্যায়ের রাজনৈতিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক আইজিপি শহিদুল হক, সাবেক ডিএমপি কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া, সাবেক এসবি প্রধান মনিরুল ইসলামসহ পুলিশের আরও কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৬ সালের ২৫ জুলাই কল্যাণপুরের একটি বাড়িতে পরিচালিত অভিযানটি প্রকৃতপক্ষে একটি “সাজানো ঘটনা” ছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ওই অভিযানে নিহত ৯ তরুণকে আগেই দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আটক করা হয়েছিল এবং কেউ কেউ দীর্ঘ সময় গোয়েন্দা বা পুলিশ হেফাজতে ছিলেন। পরবর্তীতে পরিকল্পিতভাবে তাদের একটি বাড়িতে নিয়ে গিয়ে বিশেষ বাহিনীর অভিযানের আড়ালে গুলি করে হত্যা করা হয়—এমন অভিযোগই প্রসিকিউশন পক্ষ ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন করেছে।
তৎকালীন সময়ে ঘটনাটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে “জঙ্গি আস্তানায় সফল অভিযান” হিসেবে প্রচার করা হয়েছিল। তবে বর্তমান অভিযোগে বলা হয়েছে, সেটি ছিল বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, যা একটি সুপরিকল্পিত নীতির অংশ হতে পারে। প্রসিকিউশন দাবি করেছে, জনমনে ভীতি সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যে এ ধরনের অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।
অভিযোগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, ওই সময় ইসলামপন্থী বা ধর্মীয় ভাবধারার তরুণদের বিরুদ্ধে জঙ্গি তৎপরতার অভিযোগ তুলে একাধিক অভিযানে প্রাণহানির ঘটনা ঘটে, যেগুলোকে প্রসিকিউশন একটি বিস্তৃত ও সংগঠিত প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরছে। এসব কর্মকাণ্ডকে মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞার আওতায় আনার চেষ্টা করা হয়েছে।
তবে অভিযুক্তদের পক্ষ থেকে এখনো এ অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। আইনগত প্রক্রিয়ায় অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত অভিযুক্তরা নির্দোষ বলে বিবেচিত হবেন—এটাই প্রচলিত আইনি নীতি।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দাখিল হওয়া মানেই বিচার প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ শুরু হওয়া। এখন ট্রাইব্যুনাল অভিযোগ গ্রহণযোগ্য কি না, তা পর্যালোচনা করবে। অভিযোগ গৃহীত হলে সাক্ষ্যগ্রহণ, প্রমাণ উপস্থাপন এবং প্রতিরক্ষা পক্ষের শুনানিসহ দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া চলবে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো অতীতে কল্যাণপুর অভিযানের মতো ঘটনাগুলোর স্বচ্ছ তদন্তের দাবি জানিয়ে আসছিল। তাদের মতে, বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগের ক্ষেত্রে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পূর্বের অবস্থান ছিল—তারা জঙ্গিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবেই এসব পদক্ষেপ নিয়েছে।
বর্তমান অভিযোগ দাখিলের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্কিত একটি ঘটনা আবারও জাতীয় আলোচনায় উঠে এসেছে। এই মামলার অগ্রগতি দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট—সব ক্ষেত্রেই প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।
Leave a comment