উন্নত জীবনের আশায় উত্তাল সমুদ্র পাড়ি দিয়ে ইউরোপে পৌঁছানোর স্বপ্ন এখন এক দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। লিবিয়া থেকে সাগরপথে গ্রিস যাওয়ার পথে তীব্র খাবার ও পানির সংকটে প্রাণ হারিয়েছেন ১৮ জন অভিবাসনপ্রত্যাশী। মর্মান্তিক এই যাত্রায় নিহতদের মধ্যে অন্তত ১০ জনের পরিচয় শনাক্ত করা গেছে, যাদের সবার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলায়। বেঁচে যাওয়া ও উদ্ধারকৃতদের বর্তমানে গ্রিসের একটি শরণার্থী ক্যাম্পে রাখা হয়েছে।
গ্রিসের ক্যাম্পে থাকা প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের বরাতে জানা যায়, গত সপ্তাহে দালালের মাধ্যমে একটি রাবারের বোটে করে একদল অভিবাসনপ্রত্যাশী গ্রিসের উদ্দেশ্যে রওনা হয়েছিলেন। পথিমধ্যে যান্ত্রিক গোলযোগ বা দিকভ্রান্ত হয়ে বোটটি দীর্ঘ ছয় দিন মাঝ সমুদ্রে ভাসতে থাকে।
এ সময় বোটে থাকা অভিবাসনপ্রত্যাশীদের কাছে থাকা খাবার ও বিশুদ্ধ পানি ফুরিয়ে যায়। অনাহার এবং তীব্র পানিশূন্যতায় একের পর এক মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসহ্য যন্ত্রণায় বোটের মধ্যেই ১৮ জন প্রাণ হারান। পরিস্থিতির ভয়াবহতায় অন্য যাত্রীরা বাধ্য হয়ে তাদের মরদেহগুলো সাগরেই ভাসিয়ে দেন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও স্বজনদের দেওয়া তথ্যমতে, সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার চারজন নিহত হয়েছেন। তারা হলেন—নুরুজ্জামান সরদার ময়না (৩০), সাজিদুর রহমান (২৮), সাহান এহিয়া (২৫) ও মুজিবুর রহমান (৩৮)।
এছাড়া দোয়ারাবাজার উপজেলার কবিরনগর গ্রামের আবু ফাহিম এবং জগন্নাথপুর উপজেলার সোহানুর রহমান, শায়ক আহমেদ, মো. নাঈম, আমিনুর রহমান ও মোহাম্মদ আলীর মৃত্যু হয়েছে। জগন্নাথপুর ও দোয়ারাবাজারের সংশ্লিষ্ট ইউপি চেয়ারম্যানরা তাদের নিজ এলাকার বাসিন্দাদের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
নিহতদের স্বজনরা শোকাতুর কণ্ঠে জানান, দালালের সঙ্গে ১২ লাখ টাকার চুক্তিতে গত মাসে তারা দেশ ছেড়েছিলেন। লিবিয়া পৌঁছানোর পর চুক্তির অর্ধেক টাকা পরিশোধও করা হয়। কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার পর রোববার বিকেলে গ্রিসে থাকা পরিচিতদের মাধ্যমে তারা এই দুঃসংবাদ পান। বর্তমানে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে দুইজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাদের গ্রিসের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সুজন সরকার ঘটনার ভয়াবহতা নিশ্চিত করে বলেন, “বিভিন্ন মাধ্যমে আমরা ১০ জনের মৃত্যুর খবর পেয়েছি। ভুক্তভোগীদের নাম-পরিচয় ও বিস্তারিত তথ্য যাচাই-বাছাই করতে পুলিশ এবং স্থানীয় প্রশাসন কাজ করছে। মানবপাচারকারী চক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করতেও তদন্ত শুরু হয়েছে।”
সাগরের এই মরণযাত্রা বন্ধে এবং দালাল চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। একের পর এক এমন ঘটনা ঘটলেও কর্মসংস্থানের অভাব এবং ইউরোপে যাওয়ার মোহ সাধারণ মানুষকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
Leave a comment