ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত ভেনেজুয়েলার শাসনভার যুক্তরাষ্ট্রই পরিচালনা করবে—এমন ঘোষণা দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ভেনেজুয়েলায় সামরিক অভিযান চালানো এবং দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীকে আটক করার পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এই বক্তব্য দেন তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলার জনগণের শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। সেখানে গণতান্ত্রিক রূপান্তর না হওয়া পর্যন্ত আমরা দায়িত্ব নেব।” তাঁর ভাষায়, “We will run Venezuela until a transition happens.” একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করে দেন, প্রয়োজনে আরও বড় পরিসরে দ্বিতীয় দফা সামরিক অভিযানের প্রস্তুতিও যুক্তরাষ্ট্রের রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় তেল কোম্পানিগুলো খুব শিগগিরই ভেনেজুয়েলায় কার্যক্রম শুরু করবে। তাঁর দাবি, এসব কোম্পানি দেশটির ‘ভেঙে পড়া জ্বালানি অবকাঠামো’ সংস্কারে ভূমিকা রাখবে এবং তেল খাতকে পুনরুজ্জীবিত করে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সচল করবে। ট্রাম্প বলেন, “ভেনেজুয়েলার বিপুল সম্পদ দেশটির মানুষের কল্যাণে কাজে লাগানো হবে।”
শনিবার ভেনেজুয়েলায় চালানো অভিযানে মাদুরো ও তাঁর স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে আটক করে দেশটির বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জানানো হয়। পরে তাদের একটি মার্কিন নৌযানে স্থানান্তর করা হয়। এই অভিযানকে ‘অত্যন্ত সফল’ উল্লেখ করে ট্রাম্প মার্কিন সামরিক বাহিনীর সদস্যদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, “গত রাতে মার্কিন বাহিনী যা করেছে, পৃথিবীর আর কোনো দেশ তা করতে পারেনি।”
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি জানিয়েছেন, নিকোলাস মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও অস্ত্রচালানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর বিরুদ্ধে নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট ফেডারেল আদালতে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ কেমন হবে—এ বিষয়ে এখনও বিস্তারিত কিছু জানাননি ট্রাম্প। তবে তিনি বলেছেন, একটি বিশেষ ‘গ্রুপ’ বা প্রশাসনিক কাঠামো গঠন করা হবে, যারা দেশটির শাসনব্যবস্থা তদারকি করবে। “আমরা একদল মানুষ নিয়ে বিষয়টি দেখভাল করব এবং নিশ্চিত করব যেন সবকিছু সঠিকভাবে পরিচালিত হয়,”—বলেন তিনি।
এই গ্রুপে ভেনেজুয়েলার ভেতর থেকে কারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প জানান, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ইতোমধ্যে ভেনেজুয়েলার ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেসের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন। ট্রাম্পের দাবি, রদ্রিগেস যুক্তরাষ্ট্রের নির্দেশনা মেনে চলতে প্রস্তুত থাকার ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে ট্রাম্পের এই দাবির পরপরই ভেনেজুয়েলার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক ভাষণে ডেলসি রদ্রিগেস সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “ভেনেজুয়েলায় নিকোলাস মাদুরোই একমাত্র বৈধ প্রেসিডেন্ট” এবং সরকার দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে। তাঁর এই বক্তব্য দেশটির ভেতরে ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক আইন ও রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে গুরুতর বিতর্ক উসকে দিতে পারে। বিশেষ করে ভেনেজুয়েলার বিপুল তেলসম্পদের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহকে কেন্দ্র করে ভূরাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ নতুন মাত্রা পেয়েছে।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, ভেনেজুয়েলায় প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মজুদ রয়েছে, যা বিশ্বের মোট তেল মজুদের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, নিষেধাজ্ঞা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই সম্পদ পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বাস্তব অর্থেই ভেনেজুয়েলার প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নেয়, তবে তা শুধু লাতিন আমেরিকাতেই নয়, বিশ্ব রাজনীতিতেও বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দেশ ও মানবাধিকার সংগঠন পরিস্থিতির দিকে সতর্ক নজর রাখছে।
Leave a comment