প্রকাশ্যে বীভৎস খুন, টার্গেট কিলিং, গণপিটুনি ও সহিংসতার ঘটনায় বছরজুড়ে আতঙ্কে কাটিয়েছে দেশবাসী। দেশব্যাপী একের পর এক অভিযান চললেও খুন, ডাকাতি, ছিনতাই, অপহরণ ও নারী-শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ থামেনি। পুলিশের পরিসংখ্যান বলছে, বিদায়ী বছরে সারা দেশে খুন হয়েছেন ৩,৭৮৫ জন এবং বিভিন্ন অপরাধে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮১ হাজার ৭৩৭টি। একই সময়ে মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যে উঠে এসেছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-নভেম্বর সময়ে মব সহিংসতায় নিহত হয়েছেন অন্তত ১৮৪ জন।
আইনশৃঙ্খলা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে- বিশেষজ্ঞদের মতে, গণ-অভ্যুত্থানের পর অপরাধের মাত্রা একপর্যায়ে কয়েকগুণ বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অপরাধ কমলেও প্রতিদিনই মানুষ ভয়াবহ সহিংস ঘটনার মুখোমুখি হচ্ছে। সামনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন—এ প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে বলে সতর্ক করছেন তারা। পুলিশের তৎপরতা জোরদার, দ্রুত মামলা ও সঠিক তদন্ত, দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির পাশাপাশি সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার ওপরও জোর দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরাধের ধরন ও প্রবণতা- পুলিশ সদর দপ্তরের বিশ্লেষণে দেখা গেছে ছিনতাই, ডাকাতি, অপহরণ, দস্যুতা এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এক বছরে ডাকাতির ঘটনা ৭১০টি, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলা ২১ হাজার ৯৩৯টি, অপহরণ ১,১০১টি এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ৬০১টি।
মাসভিত্তিক হিসাবে জানুয়ারিতে মামলা ১৪,৫৭২টি, ফেব্রুয়ারিতে ১৩,০০২টি, মার্চে ১৬,২৪০টি, এপ্রিলে ১৬,৩৬৮টি, মে মাসে ১৬,০৪৫টি, জুনে ১৫,১৬৭টি, জুলাইয়ে ১৫,৩৮৯টি, আগস্টে ১৫,৬৫৬টি, সেপ্টেম্বরে ১৫,৪৩১টি, অক্টোবরে ১৬,১৭০টি, নভেম্বরে ১৪,৪৬৫টি এবং ডিসেম্বরে ১৩,২৩২টি। তুলনায় ২০২৪ সালে মোট মামলা ছিল ১ লাখ ৭২ হাজার ৫টি, আর ২০২৩ সালে ১ লাখ ৯৫ হাজার ৪৩৬টি।
মব সন্ত্রাসে ১১ মাসে নিহত ১৮৪ – আসকের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে মব সহিংসতায় নিহত ১৮৪ জনের মধ্যে ঢাকায় নিহত হয়েছেন ৭৮ জন—যা আগের বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। ২০২৪ সালের একই সময়ে নিহত ছিলেন ১১৪ জন, ২০২৩ সালে ৪৯ জন, ২০২২ সালে ৩১ জন এবং ২০২১ সালে ২৮ জন। অন্যদিকে, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) জানিয়েছে, রাজনৈতিক সহিংসতায় গত বছরে নিহত হয়েছেন ১২৩ জন।
আলোচিত সহিংস ঘটনা- বছরজুড়ে একাধিক নৃশংস ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্ক তৈরি করেছে। রাজধানীতে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা, চলন্ত গাড়ি থেকে নামিয়ে পিটিয়ে আইনজীবী হত্যা, শিক্ষার্থীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা, ব্যবসায়ীকে পাথর দিয়ে মাথা থেঁতলে হত্যা—এসব ঘটনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবি পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। পাশাপাশি গুলশানে এক ভবঘুরে নারীকে খুঁটিতে বেঁধে নির্যাতনের ঘটনাও তীব্র সমালোচনার জন্ম দেয়।
লুট হওয়া অস্ত্র বড় ঝুঁকি- গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেশের প্রায় ৪৬০টি থানায় হামলা ও লুটপাটে ৫,৭৬৩টি অস্ত্র লুট হয়। পুলিশের হিসাব অনুযায়ী, এখনও ১,৩৩৩টি অস্ত্র উদ্ধার হয়নি, যা বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব অস্ত্র চরমপন্থি, সন্ত্রাসী ও কিশোর গ্যাংয়ের হাতে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অস্ত্র উদ্ধারে সরকার পুরস্কার ঘোষণাসহ বিশেষ অভিযান ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ চালিয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এ অভিযানে ১৫ হাজারের বেশি গ্রেপ্তার ও ২১৮টি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।
কী বলছেন বিশেষজ্ঞ ও পুলিশ- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর অপরাধ কমার প্রত্যাশা থাকলেও বাস্তবতা উল্টো। মব সন্ত্রাসে কোনো ছাড় দেওয়া যাবে না; টহল, নজরদারি ও দ্রুত বিচার নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন জানান, গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল জোরদার করা হয়েছে। লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে আছে।
সার্বিকভাবে, পরিসংখ্যান ও ধারাবাহিক সহিংসতার চিত্র বলছে—অপরাধ দমনে দ্রুত, কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
Leave a comment