ইসরায়েলের ওপর সম্ভাব্য যেকোনো হামলার ক্ষেত্রে ইরানকে “নজিরবিহীন পরিণতির” মুখোমুখি হতে হবে—এমন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। সোমবার (১৯ জানুয়ারি) ইসরায়েলি পার্লামেন্ট নেসেটে দেওয়া এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণে তিনি এই কথা বলেন । একই সঙ্গে গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামো নিয়েও নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন তিনি।
নেতানিয়াহু বলেন, “ইরান যদি আমাদের ওপর হামলার সাহস দেখায়, তবে এমন প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হবে, যা তারা আগে কখনো দেখেনি।” তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয় যে, আঞ্চলিক নিরাপত্তা ইস্যুতে ইসরায়েল কোনো ছাড় দিতে প্রস্তুত নয়। তিনি ইঙ্গিত দেন, ইসরায়েলের নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়লে দেশটি সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগে পিছপা হবে না।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে নেতানিয়াহু শুধু ইরানকেই নয়, বরং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিও একটি শক্ত বার্তা দিয়েছেন বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে ইরান-ইসরায়েল সম্পর্ক দীর্ঘদিন ধরেই বৈরিতাপূর্ণ। সাম্প্রতিক সময়ে সেই উত্তেজনা আরও বেড়েছে, যার প্রতিফলন দেখা গেছে নেতানিয়াহুর এই কড়া অবস্থানে।
নেসেটে দেওয়া ভাষণে প্রধানমন্ত্রী অভ্যন্তরীণ সমালোচনার জবাব দিতেও ছাড়েননি। ইসরায়েলকে স্বৈরতন্ত্রের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে—এমন অভিযোগকে তিনি “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দেন। সমালোচকদের উদ্দেশে নেতানিয়াহু বলেন, যারা ইসরায়েলের গণতান্ত্রিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন, তাদের উচিত ইরানের বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকানো। তাঁর ভাষায়, ইরান আজ গভীর অস্থিরতা ও সহিংসতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা একটি স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে ইরানে তীব্র সরকারবিরোধী আন্দোলন চলছে। অর্থনৈতিক সংকট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগে শুরু হওয়া এই আন্দোলন ক্রমেই সহিংস রূপ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলমান সহিংসতায় এখন পর্যন্ত প্রায় চার হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে। যদিও তেহরান সরকার এই অস্থিরতার জন্য ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করে আসছে এবং বিদেশি উসকানির অভিযোগ তুলেছে।
নেতানিয়াহুর ভাষণে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল গাজা যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনা। তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবিত গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপে তুরস্ক বা কাতারের কোনো নিরাপত্তা বাহিনী সেখানে মোতায়েনের সুযোগ থাকবে না। তবে গাজার ভবিষ্যৎ পরিচালনার জন্য যে নির্বাহী বোর্ড গঠনের কথা ভাবা হচ্ছে, সেখানে তুরস্ক ও কাতার সদস্য হিসেবে থাকতে পারবে।
হামাস নিরস্ত্রীকরণের প্রসঙ্গে নেতানিয়াহু জোর দিয়ে বলেন , “গাজা পরিকল্পনার দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রধান শর্ত হলো হামাসকে পুরোপুরি নিরস্ত্র করা এবং গাজাকে সামরিক কার্যক্রমমুক্ত করা।” তিনি স্পষ্ট করে দেন, এই লক্ষ্য যদি কূটনৈতিক বা সহজ পথে অর্জন না হয়, তবে ইসরায়েল কঠোর পথ অবলম্বন করবে।
এই বক্তব্যের মাধ্যমে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দেন, গাজা যুদ্ধ বন্ধ হলেও নিরাপত্তা প্রশ্নে ইসরায়েলের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। হামাসকে সামরিক শক্তি হিসেবে নির্মূল করাই তাদের দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য। এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দূত স্টিভ উইটকফ গাজা যুদ্ধ বন্ধে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের কথা জানান, যা আন্তর্জাতিক মহলে আলোচনার জন্ম দেয়।
গাজা যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক চিত্রও নেতানিয়াহুর বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর শুরু হওয়া এই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন এক লাখ ৭১ হাজারেরও বেশি মানুষ। অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি, বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট গাজাকে এক গভীর দুর্যোগের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।
সব মিলিয়ে, ইরানকে লক্ষ্য করে দেওয়া হুঁশিয়ারি ও গাজা পরিকল্পনায় কঠোর শর্ত আরোপের মাধ্যমে নেতানিয়াহু মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকটে ইসরায়েলের শক্ত অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করলেন। এই বক্তব্য আঞ্চলিক রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলের নিবিড় পর্যবেক্ষণের বিষয়।
Leave a comment