আর মাত্র কয়েক দিনের অপেক্ষা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন—যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দৃষ্টিতে শুধু একটি ক্ষমতা বদলের লড়াই নয়, বরং একটি রাজনৈতিক যুগান্তরের সূচনা। ব্রিটিশ বার্তাসংস্থা রয়টার্স এই নির্বাচনকে বিশ্বের প্রথম “জেন-জি প্রভাবিত নির্বাচন” হিসেবে আখ্যা দিয়েছে ।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গত দেড় দশক ছিল টানা একদলীয় শাসনের সময়কাল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার তিনটি জাতীয় নির্বাচন আয়োজন করে, যার প্রতিটিই আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মহলে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। রয়টার্সের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এসব নির্বাচনে হয় প্রধান বিরোধী দলগুলো অংশ নেয়নি, অথবা অংশগ্রহণ ছিল সীমিত ও অকার্যকর।
এই ধারাবাহিকতার অবসান ঘটে ২০২৪ সালের আগস্টে। শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষের নেতৃত্বে সংঘটিত এক গণঅভ্যুত্থানে পতন ঘটে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের। দীর্ঘ প্রায় ১৫ বছর পর ক্ষমতা হারায় দলটি। পরবর্তী সময়ে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত হয় একটি অন্তর্বর্তী সরকার, যার অধীনেই এবার অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় নির্বাচন। এই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে—যা দেশের রাজনীতিতে এক নজিরবিহীন ঘটনা।
অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ও সমর্থকদের মতে, ২০০৯ সালের পর এই প্রথম বাংলাদেশ একটি বাস্তব প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের মুখোমুখি হচ্ছে। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক মাঠে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকা ভোটারদের মধ্যেও এবার নতুন করে আগ্রহ দেখা যাচ্ছে।
নির্বাচনী হিসাব-নিকাশে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা দল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রার্থী দিয়েছে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হয়ে এককভাবে সরকার গঠনে আত্মবিশ্বাসী।
তবে বিএনপির এই সম্ভাব্য জয়ের পথে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে জামায়াতে ইসলামি। রয়টার্সের মতে, আওয়ামী লীগের পতনের পর রাজনৈতিক শূন্যতা ও সামাজিক মেরুকরণের সুযোগ কাজে লাগিয়ে দলটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণদের একটি অংশের মধ্যে জামায়াতের রাজনৈতিক তৎপরতা নতুন মাত্রা পেয়েছে।
আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো—অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময় গড়ে ওঠা তরুণভিত্তিক রাজনৈতিক শক্তি জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। হাসিনা-বিরোধী আন্দোলনের জনপ্রিয়তা নির্বাচনী রাজনীতিতে রূপ দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দলটি শেষ পর্যন্ত জামায়াতের সঙ্গে জোট গড়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৭ কোটির বেশি জনসংখ্যার বাংলাদেশের জন্য এই নির্বাচন শুধু সরকার গঠনের প্রশ্ন নয়, বরং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ফেরানোর একটি মাইলফলক পরীক্ষা। দীর্ঘ অনিশ্চয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও আন্তর্জাতিক চাপের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন জরুরি হয়ে উঠেছে।
এ নির্বাচনের আরেকটি কৌশলগত দিক হলো পররাষ্ট্রনীতি। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণ করবে আগামী দিনে বাংলাদেশ চীন ও ভারতের মতো আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক বজায় রাখবে। দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নতুন করে সংজ্ঞায়িত হতে পারে এই ভোটের মধ্য দিয়ে।
রয়টার্স বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে ভোটারদের বয়সভিত্তিক কাঠামোতে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট ভোটারের প্রায় ২৫ শতাংশই তরুণ প্রজন্ম—যাদের অনেকেই প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয়, রাষ্ট্রীয় ন্যারেটিভ নিয়ে প্রশ্ন তোলা এই জেন-জি ভোটারদের সিদ্ধান্ত নির্বাচনী ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
এদিকে, জামায়াতে ইসলামি যে ফলই করুক না কেন, তা যে ঐতিহাসিক হতে যাচ্ছে—এ বিষয়ে রয়টার্স প্রায় নিশ্চিত। বিভিন্ন জনমত জরিপের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের পর অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের তুলনায় এবারই দলটি সবচেয়ে ভালো ফল করতে পারে।
সব মিলিয়ে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন বাংলাদেশের জন্য কেবল একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া নয়; এটি একটি রাজনৈতিক পুনর্গঠন, প্রজন্মগত পরিবর্তন এবং ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনার নির্ধারক মুহূর্ত—যার দিকে তাকিয়ে রয়েছে শুধু দেশ নয়, গোটা বিশ্ব।
Leave a comment