হিমালয়ের কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়— ভৌগোলিক অবস্থানের মতোই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ একটি এলাকা। রংপুর বিভাগের এই জেলায় রয়েছে দুটি সংসদীয় আসন, এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে প্রার্থী তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই এখানে নির্বাচনী প্রচারণা গতি পেয়েছে।
নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তথ্য অনুযায়ী, ভোটার সংখ্যা, প্রার্থীদের রাজনৈতিক পটভূমি এবং অতীত নির্বাচনের ফলাফল— সব মিলিয়ে পঞ্চগড়ের দুটি আসনেই বহুমাত্রিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইঙ্গিত মিলছে।
পঞ্চগড়–১ (সংসদীয় আসন নং–১)
পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ৫৮ হাজার ২৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ১১৯ এবং নারী ভোটার ২ লাখ ২৯ হাজার ১৪৬। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১৫৫টি।
এই আসনে এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সাতজন প্রার্থী। বিএনপির প্রার্থী মুহাম্মদ নওশাদ জমির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। তার পারিবারিক রাজনৈতিক ঐতিহ্য রয়েছে— তার বাবা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার একসময় এ আসনের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকে শাপলা কলি প্রতীকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন মো. সারজিস আলম, যিনি দলটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রধান সংগঠক। এছাড়া গণঅধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, জাসদ এবং বিএনএফ থেকেও প্রার্থীরা মাঠে রয়েছেন, যা আসনটিকে বহুদলীয় প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, এই আসনে বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। ১৯৮৬ সালে আওয়ামী লীগের সিরাজুল ইসলাম, ১৯৯১ সালে বিএনপির মির্জা গোলাম হাফিজ, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে বিএনপির জমির উদ্দিন সরকার এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের মোহাম্মদ মজাহারুল হক প্রধান নির্বাচিত হন। ফলে ঐতিহাসিকভাবে এটি একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ আসন হিসেবে বিবেচিত।
পঞ্চগড়–২ (সংসদীয় আসন নং–২)
বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ১৩ হাজার ২৬৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ২ লাখ ৭ হাজার ৩৬৭, নারী ২ লাখ ৫ হাজার ৮৯৫ এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৩ জন। এখানে মোট কেন্দ্র ১৩২টি।
এই আসনে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি ছোট দলগুলোর প্রার্থীরাও অংশ নিচ্ছেন। বিএনপির ফরহাদ হোসেন আজাদ ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. সফিউল আলম দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এছাড়া সুপ্রিম পার্টি, বাংলাদেশ জাসদ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরাও মাঠে রয়েছেন।
অতীত নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যায়, ১৯৮৬ ও ১৯৯১ সালে কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থীরা জয়ী হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি এবং ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নূরুল ইসলাম সুজন বিজয়ী হন। এ ইতিহাস ইঙ্গিত করে যে, এ আসনেও রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তনশীল।
সমগ্র চিত্র
দুটি আসনেই ভোটার উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য এবং দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুমাত্রিক। বড় দলগুলোর পাশাপাশি আঞ্চলিক ও ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর সক্রিয় অংশগ্রহণ নির্বাচনী প্রতিযোগিতাকে আরও জটিল করেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, পঞ্চগড়ের নির্বাচনী ফলাফল শুধু স্থানীয় নয়, রংপুর বিভাগের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রবণতারও একটি প্রতিফলন হতে পারে। ভোটারদের অংশগ্রহণ, প্রার্থীদের স্থানীয় সংযোগ এবং জাতীয় রাজনীতির প্রভাব— সবকিছু মিলিয়েই এই জেলার দুটি আসন নির্বাচনী মানচিত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
Leave a comment