মুসলিম উম্মাহর কাছে শাবান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতটি পরিচিত ‘শবে বরাত’ বা আরবিতে ‘লাইলাতুল বরাত’ নামে। ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি বা নাজাত। ইসলামী পরিভাষায় এ রাতকে অনেকেই রহমত, মাগফিরাত ও আত্মসমালোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় হিসেবে বিবেচনা করেন। বিভিন্ন হাদিসে এ রাতের ফজিলত সম্পর্কে বর্ণনা এসেছে—যদিও আলেমদের মধ্যে কিছু আমল ও রেওয়াজের ব্যাপারে মতভেদ রয়েছে। তাই এ রাতে বাড়তি ইবাদতে মনোযোগী হওয়া ভালো, তবে নির্দিষ্ট পদ্ধতিকে বাধ্যতামূলক মনে করা উচিত নয়।
শবে বরাত যেভাবে পালন করবেন-
তওবা ও আত্মসমালোচনা-
শবে বরাতের অন্যতম প্রধান আমল হলো আন্তরিক তওবা। মানুষ সারা বছর ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় নানা ভুল ও গুনাহে জড়িয়ে পড়ে। এই রাত হতে পারে আত্মসমালোচনার এক মূল্যবান সুযোগ—নিজের কাজের হিসাব নেওয়া, ভুলের জন্য আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে গুনাহ থেকে দূরে থাকার দৃঢ় সংকল্প করা। তওবা শুধু মুখের কথা নয়; বরং আচরণে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও এর অংশ।
নফল নামাজ-
এ রাতে নফল ইবাদতে সময় কাটানো মুস্তাহাব হিসেবে বিবেচিত। দুই রাকাত করে যতটুকু সম্ভব নফল নামাজ আদায় করা যেতে পারে। তবে শবে বরাত উপলক্ষে নির্দিষ্ট কোনো নামাজ বা নির্দিষ্ট রাকাত সংখ্যা বাধ্যতামূলক—এমন বিশ্বাস থেকে বিরত থাকা জরুরি। নামাজে ধীরস্থিরতা, কোরআন তেলাওয়াত, রুকু-সিজদায় মনোযোগী দোয়া ও খুশু-খুজু বজায় রাখাই মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।
কোরআন তেলাওয়াত ও জিকির-
কোরআন তেলাওয়াত অন্তরকে পরিশুদ্ধ করে এবং ঈমানকে দৃঢ় করে। এ রাতে সময় বের করে কোরআন পড়া, তার অর্থ বোঝার চেষ্টা করা এবং তাসবিহ-তাহলিল, দরুদ শরিফ পাঠে মনোযোগ দেওয়া উত্তম আমল। অল্প হলেও মনোযোগসহ তেলাওয়াত অধিক ফলপ্রসূ।
দান-সদকা-
দান-সদকা সব সময়ই কল্যাণকর, আর বরকতময় রাতগুলোতে এর গুরুত্ব আরও বেড়ে যায়। দরিদ্র, অসহায়, রোগী বা বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের বড় মাধ্যম। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ আল্লাহর রাস্তায় যা ব্যয় করে, আল্লাহ তার উত্তম প্রতিদান দেন (সূরা সাবা: ৩৯)। তাই সামর্থ্য অনুযায়ী গোপনে দান করা উত্তম।
দোয়ার গুরুত্ব-
দোয়া মুমিনের শক্তিশালী অস্ত্র। নিজের গুনাহ মাফ, ঈমানের দৃঢ়তা, হালাল রিজিক, পরিবার-পরিজনের কল্যাণ এবং দুনিয়া-আখিরাতের শান্তির জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা যেতে পারে। পাশাপাশি সমগ্র মুসলিম উম্মাহর শান্তি ও হিদায়াতের জন্য দোয়া করা প্রশংসনীয়।
কবর জিয়ারত ও মৃতদের জন্য দোয়া-
হাদিসে বর্ণিত আছে, রাসূলুল্লাহ (সা.) কিছু বিশেষ রাতে কবরস্থানে গিয়ে মৃতদের জন্য দোয়া করতেন। তাই এ রাতে প্রয়াত আত্মীয়-স্বজনের রুহের মাগফিরাত কামনা করা যেতে পারে—সরাসরি কবর জিয়ারত সম্ভব না হলেও ঘরে বসে দোয়া করা যায়। এতে মৃত্যুর কথা স্মরণ হয় এবং মানুষ আখিরাতমুখী হয়।
নফল রোজা-
শাবান মাসে বেশি বেশি রোজা রাখার কথা হাদিসে পাওয়া যায়। আরবি মাসের ১৫ তারিখে রোজা রাখাও অনেক আলেম নফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাই শবে বরাতের পরদিন নফল রোজা রাখা উত্তম আমলের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
বর্জন করবেন যেসব কাজ-
শবে বরাত ইবাদতের রাত—আতশবাজি, ফানুস ও অনর্থক আড্ডা এ রাতের ভাবগাম্ভীর্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তেমনি ভিত্তিহীন রেওয়াজ বা বিদয়াতপূর্ণ কাজ থেকেও দূরে থাকা প্রয়োজন। ইবাদতের নামে অপচয় বা প্রদর্শন ইসলামসম্মত নয়।
শবে বরাত কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আত্মশুদ্ধি, তওবা, ইবাদত ও আল্লাহর দিকে ফিরে আসার একটি সুযোগ। এ রাতের মূল বার্তা হলো—গুনাহ থেকে ফিরে আসা, হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করা এবং মানবিকতা ও আল্লাহভীতির পথে নিজেকে গড়ে তোলা। সংযম, আন্তরিকতা ও সুন্নাহসম্মত আমলই এ রাতের প্রকৃত সৌন্দর্য।
Leave a comment