ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থায় নতুন এক দৃষ্টান্ত স্থাপিত হতে যাচ্ছে। প্রথমবারের মতো কারাবন্দিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ চালু হওয়ায়, অন্তত ২২ জন সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) ও মন্ত্রী কারাগার থেকেই পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দেবেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে রয়েছেন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সাদেক খান এবং ডা. এনামুর রহমানসহ আরও কয়েকটি পরিচিত নাম।
নির্বাচন কমিশন (ইসি) সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন নির্বাচনে ভোট দেওয়ার জন্য মোট প্রায় ৫ হাজার ৯৬০ জন কারাবন্দি নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮৪ হাজার বন্দি থাকলেও বিভিন্ন কারণে এ সংখ্যা তুলনামূলক কম। কারা সূত্র বলছে, অনেক বন্দির জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) না থাকা এবং কেউ কেউ ভোট দিতে অনাগ্রহী থাকায় নিবন্ধিত ভোটারের সংখ্যা সীমিত রয়েছে।
নির্বাচন কমিশন সম্প্রতি আইন সংশোধনের মাধ্যমে হাজতিদের ভোটাধিকার প্রয়োগের বিধান যুক্ত করে। এর ফলে বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত হলেও ভোটার হিসেবে বৈধতা থাকা বন্দিরা পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট দিতে পারবেন। প্রবাসী ভোটের পাশাপাশি এই উদ্যোগকে ভোটার অংশগ্রহণ সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সারাদেশের ৭৫টি কারাগারের মধ্যে ৭১টিতে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ইতোমধ্যে ভোটকেন্দ্র স্থাপন, নিরাপত্তা পরিকল্পনা, ব্যালট বিতরণ ও সংগ্রহ প্রক্রিয়াসহ সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কারাগারগুলোতে নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটকেন্দ্র স্থাপন করা হচ্ছে।
পোস্টাল ব্যালট প্রক্রিয়ায় নিবন্ধিত বন্দিদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যালট পেপার সরবরাহ করা হবে। ভোট প্রদান শেষে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ব্যালট সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে পাঠানো হবে। নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে পৌঁছানো ব্যালটই কেবল গণনায় অন্তর্ভুক্ত হবে।
নির্বাচনী বিশ্লেষকদের মতে, বন্দিদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অন্তর্ভুক্তিমূলক চরিত্রকে শক্তিশালী করে। আন্তর্জাতিকভাবে অনেক দেশেই কারাবন্দিদের ভোটাধিকার নিয়ে নীতিগত অবস্থান রয়েছে। বাংলাদেশে এই প্রথমবার এ ধরনের ব্যবস্থা চালু হওয়ায় বিষয়টি রাজনৈতিক ও আইনি দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে এ উদ্যোগ ঘিরে কিছু বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। যেমন—সব বন্দির পরিচয় যাচাই, এনআইডি মিলানো, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ভোটের গোপনীয়তা বজায় রাখা। নির্বাচন কমিশন ও কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এসব বিষয় বিবেচনায় রেখে পর্যাপ্ত নির্দেশনা ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কারা প্রশাসনের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভোটগ্রহণের দিন কারাগারের ভেতরে স্বাভাবিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি অতিরিক্ত সতর্কতা থাকবে। নির্বাচনী সামগ্রী সংরক্ষণ, বিতরণ ও ফেরত আনার ক্ষেত্রে নির্ধারিত প্রটোকল অনুসরণ করা হবে।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, সাবেক এমপি-মন্ত্রীসহ পরিচিত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের কারাগার থেকে ভোট দেওয়ার বিষয়টি প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। এটি একদিকে আইনগত প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতা নির্দেশ করে, অন্যদিকে নাগরিক অধিকার প্রয়োগের একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করে।
Leave a comment