চট্টগ্রামের আলোচিত আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হয়েছে। এই মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি গণেশকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)।
র্যাব-৭-এর সহকারী পরিচালক (মিডিয়া) এআরএম মোজাফফর হোসেন রোববার (১১ জানুয়ারি) সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, শনিবার (১০ জানুয়ারি) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নগরের কোতোয়ালি থানার লালদীঘি এলাকায় অবস্থিত জেলা পরিষদ সুপার মার্কেট থেকে গণেশকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে কোতোয়ালি থানা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
গ্রেপ্তার হওয়া গণেশের বয়স ১৯ বছর। তিনি চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানাধীন সেবক কলোনির বাসিন্দা এবং শরিফ দাশের ছেলে। র্যাব জানায়, গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে তার অবস্থান শনাক্ত করার পর একটি বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ২৬ নভেম্বর। সেদিন বাংলাদেশ সম্মিলিত সনাতনী জাগরণ জোটের মুখপাত্র চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের জামিন আবেদন নামঞ্জুর হলে চট্টগ্রাম আদালত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। কারাগারে নেওয়ার জন্য পুলিশ যখন চিন্ময় কৃষ্ণ দাসকে প্রিজন ভ্যানে তোলে, তখন তার অনুসারীরা সেটি আটকে দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করে।
প্রায় তিন ঘণ্টা ধরে চলা এই বিক্ষোভ এক পর্যায়ে সহিংস রূপ নেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী লাঠিপেটা ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। এতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসের অনুসারীদের সঙ্গে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনীর সদস্যদের তীব্র সংঘর্ষ শুরু হয়।
এই বিশৃঙ্খলার মধ্যেই আদালত চত্বরে রাখা বেশ কয়েকটি মোটরসাইকেল ও যানবাহন ভাঙচুর করা হয়। একই সঙ্গে আদালত ভবনের প্রবেশপথের বিপরীতে অবস্থিত রঙ্গম সিনেমা হলের গলিতে আইনজীবী সাইফুল ইসলাম আলিফকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যা করা হয়। প্রকাশ্যে একজন আইনজীবীকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা চট্টগ্রামসহ সারা দেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এই ঘটনায় নিহত আলিফের বাবা জামাল উদ্দিন কোতোয়ালি থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। এজাহারে তিনি ৩১ জনের নাম উল্লেখ করেন। তদন্ত শুরু হওয়ার পর মামলাটি দ্রুতই একটি স্পর্শকাতর ও বহুল আলোচিত ইস্যুতে পরিণত হয়।
২০২৫ সালের ১ জুন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা, তৎকালীন কোতোয়ালি জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মাহফুজুর রহমান, চট্টগ্রাম আদালতের সংশ্লিষ্ট শাখায় চার্জশিট দাখিল করেন। এতে চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারীসহ মোট ৩৮ জনকে আসামি করা হয়।
পরবর্তীতে গত ২৫ আগস্ট চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট এস এম আলাউদ্দিন মাহমুদের আদালতে চার্জশিটের গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। শুনানি শেষে আদালত ৩৯ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট গ্রহণ করেন। যদিও মামলার এজাহারে যাদের নাম ছিল, তাদের মধ্যে গগন দাশ, বিশাল দাশ ও রাজকাপুর মেথরের বিরুদ্ধে সম্পৃক্ততার প্রমাণ না পাওয়ায় তদন্ত কর্মকর্তা তাদের অব্যাহতির আবেদন করেন, তবে নতুন করে চিন্ময় কৃষ্ণ দাসসহ আরও ১০ জনকে অন্তর্ভুক্ত করে আসামির সংখ্যা ৩৯-এ উন্নীত করা হয়।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, গণেশ এই মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আসামি হিসেবে বিবেচিত। তিনি ঘটনার সময় আদালত এলাকায় উপস্থিত ছিলেন এবং সহিংস হামলায় প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকার অভিযোগ রয়েছে। তবে বিস্তারিত ভূমিকা এখনো আদালতে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা মনে করছেন, তার গ্রেপ্তারের মাধ্যমে ঘটনার পেছনের নেটওয়ার্ক ও পরিকল্পনা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। মামলার বাকি পলাতক আসামিদের ধরতেও এটি সহায়ক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একজন আইনজীবীকে আদালত প্রাঙ্গণের কাছেই নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলার ওপর গভীর আঘাত হানে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন না হলে বিচারপ্রার্থীদের আস্থা আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
Leave a comment