ক্ষমতায় গেলে দেশের ৫ লাখ স্নাতকধারী বেকার তরুণকে বিনা সুদে ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির ঘোষণায় বলা হয়েছে, শিক্ষাজীবন শেষ করে চাকরি পাওয়ার আগ পর্যন্ত সর্বোচ্চ দুই বছর মেয়াদে প্রতি মাসে ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত ঋণ সুবিধা পাবেন নির্বাচিত তরুণেরা। রাজধানীতে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এ দলটির পক্ষ থেকে এ ঘোষণা দেওয়া হয়।
মঙ্গলবার রাজধানীর একটি হোটেলে দিনব্যাপী এই নীতি সম্মেলনের আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী। সম্মেলনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, শিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি ও সামাজিক নিরাপত্তা—এমন বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত নীতিপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, শিক্ষাবিদ, গবেষক, গণমাধ্যম সম্পাদক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
জামায়াতের ঘোষণায় বলা হয়, উচ্চশিক্ষিত বেকারদের আর্থিক চাপ কমানো এবং কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ তৈরি করতেই এই সুদমুক্ত ঋণ কর্মসূচি প্রস্তাব করা হয়েছে। দলটির মতে, চাকরি না পাওয়া পর্যন্ত সময়টা তরুণদের জন্য সবচেয়ে সংকটময়; এই সময় আর্থিক সহায়তা পেলে তারা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
একই সঙ্গে মেধা ও প্রয়োজনের ভিত্তিতে ১ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য মাসিক ১০ হাজার টাকা করে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে জামায়াত। দলটি জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষা যেন আর্থিক অক্ষমতার কারণে থেমে না যায়—এ লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ। এ ছাড়া প্রতিবছর বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়াশোনার জন্য ১০০ শিক্ষার্থীকে সুদমুক্ত শিক্ষাঋণ দেওয়ার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে।
শিক্ষা খাতে আরও বড় পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে জামায়াত জানায়, ক্ষমতায় গেলে রাজধানীর ইডেন মহিলা কলেজ, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ এবং হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। পাশাপাশি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন বড় কলেজগুলোকে পর্যায়ক্রমে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনার কথাও জানানো হয়।
অর্থনীতি ও শিল্প খাত নিয়ে ঘোষণায় জামায়াত বলেছে, আগামী তিন বছরে শিল্প খাতে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মাশুল বাড়ানো হবে না। বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা সরকারি–বেসরকারি অংশীদারত্বে (পিপিপি) পুনরায় চালু করা হবে এবং এসব প্রতিষ্ঠানের ১০ শতাংশ মালিকানা শ্রমিকদের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ব্যবসাবান্ধব নীতি, সহজ লাইসেন্সিং ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণসুবিধা চালুর প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়।
স্বাস্থ্য খাতে জামায়াতের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে, ৬০ বছরের বেশি বয়সী নাগরিক ও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা। পাশাপাশি দেশের ৬৪ জেলায় ৬৪টি বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথা জানানো হয়। দলটির মতে, স্বাস্থ্যসেবা নাগরিকের মৌলিক অধিকার, যা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
দুর্নীতি দমন প্রসঙ্গে জামায়াত জানায়, ক্ষমতায় গেলে তারা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করবে। কর ও ভ্যাট কাঠামো সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলা হয়, ধাপে ধাপে কর কমিয়ে দীর্ঘ মেয়াদে করহার ১৯ শতাংশে এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। পাশাপাশি স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড চালুর পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবার তথ্য এক কার্ডে সংযুক্ত থাকবে।
সম্মেলনে ‘ফার্স্ট থাউজেন্ড ডেজ প্রোগ্রাম’-এর ঘোষণাও দেয় জামায়াত। এই কর্মসূচির আওতায় গর্ভধারণ থেকে শিশুর দুই বছর বয়স পর্যন্ত মা ও শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি নিশ্চিত করে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তরুণদের কর্মসংস্থানে জামায়াতের পরিকল্পনাগুলো ছিল সম্মেলনের অন্যতম আলোচিত বিষয়। দলটি জানিয়েছে, দক্ষ জনশক্তি ও চাকরি সংস্থানের জন্য একটি নতুন মন্ত্রণালয় গঠন করা হবে। পাঁচ বছরে এক কোটি তরুণকে বাজারভিত্তিক দক্ষতার প্রশিক্ষণ দেওয়া, প্রতিটি উপজেলায় গ্র্যাজুয়েটদের জন্য ‘ইয়ুথ টেক ল্যাব’ স্থাপন এবং প্রতিটি জেলায় ‘জেলা জব ইয়ুথ ব্যাংক’ গঠনের পরিকল্পনা রয়েছে। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পাঁচ বছরে ৫০ লাখ তরুণের কর্মে প্রবেশ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
নারী, তরুণ ও অবহেলিত জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিয়ে পাঁচ লাখ উদ্যোক্তা তৈরি, ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার গড়ে তোলা এবং স্বল্পশিক্ষিত যুবকদের জন্য বিশেষ দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি চালুর কথাও জানানো হয়।
তথ্যপ্রযুক্তি খাত উন্নয়নে জামায়াত ‘ভিশন ২০৪০’ ঘোষণা করেছে। এই ভিশনের আওতায় ২০৩০ সালের মধ্যে ২০ লাখ আইসিটি-সম্পৃক্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ন্যাশনাল পেমেন্ট গেটওয়ে স্থাপন, আইসিটি খাত থেকে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয় এবং জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতিতে রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ ছাড়া দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলে আগামী পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে প্রবাসী আয় দুই থেকে তিন গুণ বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে জামায়াত। একই সঙ্গে ‘ইন্টেলেকচুয়াল রেমিট্যান্স’-এর ধারণার মাধ্যমে প্রবাসী বাংলাদেশি পেশাজীবী, গবেষক ও শিক্ষকদের দেশে ফেরাতে উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়।
সামগ্রিকভাবে, ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এ ঘোষিত এই নীতিপ্রস্তাবগুলো জামায়াতের অর্থনীতি ও উন্নয়ন ভাবনার একটি বিস্তৃত রূপরেখা তুলে ধরে। এসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন কতটা সম্ভব এবং রাজনৈতিক বাস্তবতায় কীভাবে কার্যকর হবে—তা নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ চললেও, সম্মেলনের ঘোষণাগুলো দেশের রাজনৈতিক ও নীতিগত আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
Leave a comment