যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর আহ্বান করলেও বৃটেন এবং অন্যান্য মিত্র দেশগুলো এ আহ্বানে সাড়া দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছে।
টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃটেনের জ্বালানি বিষয়ক মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পুনঃস্থাপনের জন্য সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে তা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। তবে কোনো দৃঢ় অঙ্গীকার এখনও দেওয়া হয়নি।
বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, যুদ্ধজাহাজ পাঠানো হবে না। যদিও কিছু মাইন শনাক্তকারী ড্রোন প্রেরণ করা বিবেচনার মধ্যে রয়েছে, বড় ধরনের সামরিক অংশগ্রহণের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়নি।
ফ্রান্স, জার্মানি, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়াও ট্রাম্পের আহ্বানে সাড়া দিতে অনীহা প্রকাশ করেছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই অনীহার কারণে হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হতে পারে।
ইরানের পক্ষ থেকেও সতর্কবার্তা এসেছে—যে কোনো দেশের সরাসরি সামরিক অংশগ্রহণকে শত্রুপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করা হবে। ফলে যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তার এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ আরও বেড়ে যাচ্ছে।
সপ্তাহান্তে ট্রাম্প ইরানের গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন ঘাঁটিকে লক্ষ্যবস্তু করার পর তেলের দাম রাতারাতি $103 থেকে $106 ডলারে উঠেছে। হরমুজ প্রণালি অবরোধের কারণে তেলের আন্তর্জাতিক সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলছেন, ব্রেন্ট ক্রুডের দাম সপ্তাহের শুরুতে $110 প্রতি ব্যারেল ছুঁতে পারে। জেপি মর্গান এবং প্যানমিউর লিবারামের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, প্রণালিতে সংঘর্ষ বা জাহাজ চলাচল সীমিত হলে, পণ্যের ঘাটতি এবং মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে।
বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী কেয়ার স্টারমার সোমবার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য জরুরি ৫ কোটি পাউন্ড সহায়তা ঘোষণা করবেন। এই তহবিল প্রধানত হিটিং অয়েল ব্যবহারকারী প্রায় ১০ লাখ পরিবারকে লক্ষ্য করে, যাদের বেশিরভাগই উত্তর আয়ারল্যান্ডের গ্রামীণ এলাকায় বসবাস করছেন।ঘরোয়া রাজনৈতিক চাপ এবং তেলের দাম বৃদ্ধির প্রভাব মোকাবিলার জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
রোববার রাতে স্টারমার ট্রাম্পের সঙ্গে ফোনে হরমুজ প্রণালির পুনঃনিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেন। তবে পূর্বে ট্রাম্পের হামলাকে সমর্থন না করায় স্টারমারকে ট্রাম্প “চার্চিল নন” বলে কটাক্ষ করেছিলেন। যুদ্ধজাহাজ না পাঠানোর সিদ্ধান্তে দুই নেতার মধ্যে মতবিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী রোববার বৃটেনকে সতর্ক করেছেন যে, তারা বৃটেনের সঙ্গে যুদ্ধে নেই। তবে যদি বৃটেন অংশগ্রহণ করে, তা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন ইরানবিরোধী আগ্রাসনে অংশ হিসেবে দেখা হবে।
ফ্রান্সের সশস্ত্র বাহিনী বিষয়ক মন্ত্রী বলছেন, দেশটি প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান রাখবে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল নেতৃত্বাধীন যুদ্ধে সরাসরি জড়াবে না। দক্ষিণ কোরিয়া পরিস্থিতি ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে এবং জার্মানি হরমুজ প্রণালিতে নৌমিশন সম্প্রসারণ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছে।
হরমুজ প্রণালির অবরোধ শুধু তেলের দামের ওপর প্রভাব ফেলছে না। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা জরুরি মজুত থেকে ৪০ কোটি ব্যারেল তেল ছাড়ার কথা জানিয়েছে। তবে বৃটেনে সতর্ক করা হয়েছে যে, পেট্রোলিয়ামভিত্তিক ঔষধ যেমন অ্যাসপিরিন, প্যারাসিটামল, আইবুপ্রোফেন এবং বিভিন্ন অ্যান্টিবায়োটিকের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ইসরাইলি সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, সংঘর্ষ ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত চলতে পারে। ট্রাম্প খার্গ দ্বীপে বিমান হামলার নির্দেশ দেওয়ার পর আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা পুনঃস্থাপনা না হওয়া পর্যন্ত তেলের বাজার অস্থির থাকবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যেও ঝুঁকি থাকবে।
হরমুজ প্রণালিতে যুদ্ধজাহাজ পাঠাতে ব্রিটেন ও অন্যান্য মিত্র দেশের অনীহা, তেলের বাজারের অস্থিরতা এবং আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক টানাপোড়েন—সব মিলিয়ে এই সংঘাত আরও জটিল এবং দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করছে।
Leave a comment