সুন্দরবনে ভ্রমণে গিয়ে সশস্ত্র দস্যুদের হাতে রিসোর্ট মালিকসহ তিন পর্যটক অপহৃত হওয়ার ঘটনায় পর্যটননির্ভর এ অঞ্চলে নতুন করে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের ঢাংমারী এলাকার সুন্দরবনসংলগ্ন কেনুর খাল থেকে তাদের অপহরণ করা হয় বলে স্থানীয় প্রশাসন ও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।
দাকোপ থানার তথ্য অনুযায়ী, অপহৃত ব্যক্তিরা হলেন—ঢাংমারী এলাকার ‘গোল কানন’ রিসোর্টের মালিক শ্রীপতি বাছাড় এবং দুই পর্যটক মো. সোহেল ও জনি। অপহরণের পর দস্যুরা জিম্মিদের মুক্তির বিনিময়ে মোটা অংকের মুক্তিপণ দাবি করেছে বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
স্থানীয় প্রশাসন ও বনবিভাগ সূত্র জানায়, শুক্রবার সকালে ঢাকা থেকে নারী-পুরুষ মিলিয়ে চার পর্যটক সুন্দরবনে ভ্রমণে আসেন। তারা ঢাংমারী এলাকায় অবস্থিত ‘গোল কানন’ রিসোর্টে আগাম বুকিং নিয়ে দুপুরে সেখানে পৌঁছান এবং রাতযাপনের প্রস্তুতি নেন। বিকেলের দিকে রিসোর্ট মালিক শ্রীপতি বাছাড়সহ ওই পর্যটকেরা একটি নৌকায় করে বনের ভেতরের ছোট খালে ঘুরতে বের হন।
এই সময় সুন্দরবনের অভ্যন্তরে কেনুর খাল এলাকায় আগে থেকে ওত পেতে থাকা সশস্ত্র দস্যু দল নৌকাটি ঘিরে ফেলে। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্রের ভাষ্যমতে, দস্যুরা অস্ত্রের মুখে নৌকায় থাকা সবাইকে জিম্মি করে নিয়ে যায়।
রিসোর্ট মালিক শ্রীপতি বাছাড়ের ছোট ভাই উত্তম বাছাড় বলেন, “রিসোর্টসংলগ্ন খাল এলাকা থেকেই দস্যুরা নারীসহ পাঁচজনকে তুলে নেয়। পরে রাতে দুই নারী পর্যটককে রিসোর্টে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। তবে আমার ভাই শ্রীপতি বাছাড়সহ দুই পুরুষ পর্যটককে তারা জিম্মি করে রাখে।”
উত্তম বাছাড়ের দাবি, অপহৃতদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে দস্যুরা পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে এবং মুক্তির জন্য মোটা অংকের টাকা দাবি করেছে। তবে নিরাপত্তাজনিত কারণে মুক্তিপণের পরিমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
এই ঘটনার পর শনিবার (৩ জানুয়ারি) দিনভর ঢাংমারী ও আশপাশের রিসোর্ট এলাকায় পর্যটক যাতায়াত কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। কোনো ট্যুর নৌযান ওই এলাকায় প্রবেশ করেনি বলে স্থানীয় নৌযান মালিকেরা জানিয়েছেন। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অপহরণের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর পর্যটকদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।
এ বিষয়ে বনবিভাগের ঢাংমারী স্টেশন কর্মকর্তা সুরজিৎ চৌধুরী বলেন, “আমি অপহরণের বিষয়টি শুনেছি। তবে এখনো নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না কোন দস্যু বাহিনী এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত।” তিনি আরও জানান, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং বনবিভাগ পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে।
অন্যদিকে খুলনার দাকোপ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুর রহমান জানান, অপহৃত রিসোর্ট মালিক ও দুই পর্যটককে উদ্ধারে থানা পুলিশ, নৌপুলিশ এবং কোস্টগার্ড যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। তিনি বলেন, “সুন্দরবনের বিভিন্ন খাল ও সম্ভাব্য অবস্থানে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। আশা করছি দ্রুতই অপহৃতদের নিরাপদে উদ্ধার করা সম্ভব হবে।”
স্থানীয়রা জানান, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সুন্দরবনে দস্যু দমন কার্যক্রম জোরদার হওয়ায় বড় ধরনের অপহরণের ঘটনা তুলনামূলকভাবে কমে এসেছিল। তবে নতুন করে এই অপহরণ পর্যটন নিরাপত্তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুন্দরবনের দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থান এবং অসংখ্য খাল-নদীর কারণে দস্যুদের অবস্থান শনাক্ত করা কঠিন হলেও সমন্বিত অভিযান ও গোয়েন্দা তৎপরতা জোরদার করলে দ্রুত সাফল্য পাওয়া সম্ভব।
এদিকে অপহৃতদের পরিবার উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে। তারা প্রশাসনের কাছে দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগের মাধ্যমে তাদের স্বজনদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
Leave a comment