প্রীতম দাস, সুনামগঞ্জ | সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার অন্যতম প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চাকুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়টি ১০৯ বছরে পদার্পণ করলেও উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এখানে। আধুনিক শিক্ষার যুগে এসেও যেখানে জেলার প্রতিটি উপজেলায় দৃষ্টিনন্দন নতুন ভবন নির্মিত হচ্ছে, সেখানে এই শতবর্ষী প্রতিষ্ঠানটি আজও জরাজীর্ণ ও অবহেলিত। এমনকি একটি স্থায়ী শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর বাঁশ ও কাঠ দিয়ে অস্থায়ী মিনার তৈরি করে ভাষা শহীদদের শ্রদ্ধা জানায়।
২১ ফেব্রুয়ারী (শনিবার) সরেজমিনে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো অত্যন্ত নড়বড়ে। ছাদের প্লাস্টার খসে পড়ছে, দেয়ালে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল। সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে শ্রেণিকক্ষ প্লাবিত হয়। এমন ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাঠদান করছে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় অভিভাবক সমর দাস, সুকেশ দাস ও নিরেশ দাস ক্ষোভের সাথে বলেন, “যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে জেনেও নিরুপায় হয়ে আমরা আমাদের সন্তানদের এই বিদ্যালয়ে পাঠাচ্ছি। অন্যান্য স্কুলে সরকারি বরাদ্দ পৌঁছালেও আমাদের এই প্রাচীন স্কুলটি কেন বঞ্চিত হচ্ছে, তা আমরা বুঝতে পারছি না।”
বিদ্যালয়টিতে কোনো স্থায়ী শহীদ মিনার নেই। ২১শে ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে যখন সারা দেশ শ্রদ্ধায় অবনত হয়, তখন এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা নিজেদের উদ্যোগে সংগৃহীত বাঁশ, কাঠ ও কাগজ দিয়ে শহীদ মিনার তৈরি করে। বিদ্যালয়ের ৫ম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিয়ান তালুকদার, পারমিতা সরকার ও তৃনা দাস জানায়, “আমরা প্রতি বছর কষ্ট করে বাঁশ-কাঠ দিয়ে মিনার বানাই। আমাদের খুব ইচ্ছা আমাদের স্কুলেও একটা সুন্দর স্থায়ী শহীদ মিনার থাকবে যেখানে আমরা সবাই মিলে ফুল দেব।”
বিদ্যালয়ের বর্তমান সংকট নিয়ে প্রধান শিক্ষক অসীম কুমার সিংহ অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কণ্ঠে বলেন, “আমাদের এই বিদ্যাপীঠটি অত্র এলাকার শিক্ষা বিস্তারে শত বছরের সাক্ষী। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, জেলার অন্যান্য প্রান্তরে আধুনিক বহুতল ভবন নির্মিত হলেও আমরা বরাবরের মতোই উন্নয়ন বঞ্চিত। আমাদের শিক্ষার্থীরা শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে নিজেদের হাতে বাঁশ-কাঠের মিনার বানায়—এটি যেমন গর্বের, তেমনি কর্তৃপক্ষের অবহেলার এক বড় প্রমাণ। আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছি, কিন্তু আজো কোনো নতুন ভবন বা শহীদ মিনার নির্মাণের আশ্বাস বাস্তবায়ন হয়নি।”
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে মোট ২৬৫ জন শিক্ষার্থী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে লেখাপড়া করছে। এলাকাবাসীর দাবি, হাওরবেষ্টিত এই অঞ্চলের পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করতে এখানে অবিলম্বে একটি আধুনিক ভবন ও স্থায়ী শহীদ মিনার স্থাপন করা জরুরি।
চাকুয়া গ্রামের বাসিন্দারা মাননীয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী এবং জেলা প্রশাসকের দৃষ্টি আকর্ষণ করে দ্রুত এই বিদ্যালয়ের অবকাঠামো সংস্কার ও উন্নয়নের দাবি জানিয়েছেন। তারা মনে করেন, শিক্ষার পরিবেশ উন্নত না হলে এই প্রাচীন প্রতিষ্ঠানটি অচিরেই বিলীন হয়ে যেতে পারে।

Leave a comment