মার্কিন শুল্কে বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে উদ্বেগ সৃষ্টি
বাংলাদেশের রপ্তানি খাতে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বিভিন্ন দেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর বড় অঙ্কের নতুন শুল্ক আরোপের ঘোষণার পর থেকে। বিভিন্ন দেশ একে বাণিজ্যযুদ্ধ বলে আখ্যা দিয়েছে।
৩৭ শতাংশ অতিরিক্ত শুল্ক আরোপের ঘটনা ঘটল বাংলাদেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করছিল ।
আগে ছিল গড়ে ১৫ শতাংশ। বাংলাদেশ তার প্রধান রপ্তানি পণ্য তৈরি পোশাকের ক্ষেত্রে বেশি ক্ষতির আশঙ্কা করছে। কারণ, বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক প্রধান বাজার যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে যেসব কারখানা বছরের পর বছর শুধু যুক্তরাষ্ট্রের বাজারেই রপ্তানি করে থাকে, তারা বড় সংকটের আশঙ্কা করছে।
যুক্তরাষ্ট্র তার পণ্য আমদানির উৎস দেশগুলোর বেশির ভাগের ওপর নতুন করে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করেছে। এ হার এত দিন পর্যন্ত আরোপিত শুল্কহারের অতিরিক্ত বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানি করে সেগুলোর ওপর ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয় বলে দাবি দেশটির। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন যে প্রক্রিয়ায় এই হিসাব দাঁড় করিয়েছে, তা নিয়েও বিশ্বজুড়ে চলছে আলোচনা। প্রচলিত হিসাবের বাইরে গিয়ে ট্যারিফ নির্ধারণের যে পদ্ধতি প্রকাশ হয়েছে তাতে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র একটি দেশের সঙ্গে তার বাণিজ্য ঘটতির পরিমাণকে ওই দেশ থেকে তার মোট আমদানির অঙ্ক দিয়ে ভাগ করেছে। তার পর তাকে ১০০ দিয়ে গুণ করে শতকরা হিসাব দাঁড় করিয়েছে। তার থেকে শতকরা ৫০ ভাগ ছাড় দেখাতে
তাকে দুই দিয়ে ভাগ করে প্রাপ্ত সংখ্যাকে ও দেশের জন্য ট্যারিফ হার হিসেবে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বলছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে যেসব পণ্য আমদানি হয়, তার বেশির ভাগেরই শুল্ক অনেক কম। কিছু পণ্যে কোনো শুল্ক নেই।
তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক উদ্যোক্তাদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সহসভাপতি এবং রাইজিং গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহমুদ হাসান খান বলেন , যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক নিয়ে উদ্বেগের কারণ আছে। তবে আতঙ্কের কারণ নেই। প্রতিযোগী সব দেশের পণ্যেই শুল্ক আরোপ করা রয়েছে। এত দিন ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের মধ্যেও বাংলাদেশ রপ্তানিতে ভালো করেছে। তবে ভারত ও পাকিস্তানে কম শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। তাঁর মতে, যে প্রক্রিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক আরোপ করেছে তাতে মনে হয়, দেশটি থেকে আমদানি বাড়াতে হবে। এখন দেশের মোট চাহিদার ১০ শতাংশ তুলা আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তুলা আমদানি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি আরও বাড়ানো যায়। অন্যান্য পণ্যের আমদানি বাড়ানোর সুযোগ রয়েছেc
তৈরি পোশাকের মতো অন্যান্য খাতও ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপের কারণে ।
বাংলাদেশের শতাধিক পণ্য রপ্তানি হয় দেশটিতে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে ওষুধ। বছরে আড়াই কোটি ডলারের বেশি ওষুধ রপ্তানি হয় দেশটিতে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির সাবেক মহাসচিব এবং হার্ডসন ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এসএম শফিউজ্জামান সমকালকে বলেন, প্রায় সব ধরনের কাঁচামাল আমদানি করে ওষুধ উৎপাদন করি আমরা। ডলারের বিনিময় হার বাড়ার পর থেকে চীন ও ভারতের কাছ রীতিমতো মার খাচ্ছি। এসব দেশের নিজস্ব কাঁচামাল রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে শুল্ক আরোপ ওষুধ রপ্তানির জন্য বড় ধাক্কা।
বাংলাদেশ লেদার গুডস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং এমএসডি ট্রেডিং কোম্পানির চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাসুদুর রহমান বলেন, যেখানে আমরা শুল্কমুক্ত সুবিধা চাইছি সেখানে অস্বাভাবিক উচ্চ হারে শুল্ক আরোপের ঘোষণা অপ্রত্যাশিত। যু্ক্তরাষ্ট্রের মতো বড় বাজারে চামড়া ও চামড়া পণ্য রপ্তানি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, গত অর্থবছরে ১৯ কোটি ডলারের চামড়া পণ্য রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে।
রপ্তানিকারকরা দীর্ঘ দিন অভিযোগ করে আসছেন, ব্র্যান্ডের ক্রেতারা ভোক্তা পর্যায়ে যে দামে পণ্য বিক্রি করে থাকে, তার অর্ধেকেরও কম দেয় তাদের। আবার ঐতিহাসিকভাবে মৌলিক মানের পণ্য উৎপাদন করে বাংলাদেশ। বড় হারে শুল্ক আরোপের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর বাড়তি চাপ পড়বে
অন্যান্য প্রতিযোগী দেশের তুলনায় ভালো অবস্থানে থাকলেও নতুন শুল্ক খড়্গে বাংলাদেশের মাথাব্যথার বড় কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে ভারত। অটেক্সার সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হারে রপ্তানি বেড়েছে ভারতের। এ সময় ভারতের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৩৪ শতাংশ। যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক রপ্তানিতে পঞ্চম অবস্থানে রয়েছে ভারত। নতুন শুল্ক কাঠামোয় ভারতীয় পণ্যের শুল্ক দাঁড়ায় ৪১ শতাংশ, যা বাংলাদেশের পণ্যের চেয়ে ১১ শতাংশ কম। প্রতিযোগিতায় তাই বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে থাকবে ভারত।
বাংলাদেশে বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, আপাতত একটা ধাক্কা বলে মনে হয়। তা আতঙ্কগ্রস্ত হওয়ার মতো নয়। তিনি আরও বলেন, বিভিন্ন পূর্বাভাস বলছে, আগামী প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্রের জিডিপি কমবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে। এর ওপর সব আমদানি পণ্যে এক রকম উচ্চ হারের শুল্ক আরোপ মূল্যস্ফীতিকে আরও উস্কে দেবে। এ অবস্থায় ভোক্তা পর্যায় থেকে চাপ আসবে। আগামী সপ্তাহেই হয়তো এ রকম খবর শোনা যাবে। এ রকম পরিস্থিতি সস্তা দামের মৌলিক পণ্য রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে মার্কিন ব্র্যান্ড ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা হয়তো নাও কমতে পারে।
জাহিদ হোসেন বলেন, মার্কিন প্রশাসনের দাবি, বাংলাদেশে মার্কিন পণ্যে ৭৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়। এখন সরকার যা করতে পারে তা হলো, যুক্তরাষ্ট্রের ৭৪ শতাংশ কীভাবে ৩০ শতাংশে নামিয়ে আনা যায় তার কৌশল নির্ধারণ করা।
Leave a comment