ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের উদ্যোগ হিসেবে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচি চালু করেছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেছেন, যা সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা ও নারী অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাজধানীর বনানী এলাকার টিঅ্যান্ডটি খেলার মাঠে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে ল্যাপটপের বাটন চাপ দিয়ে দেশের ১৪টি জেলায় একযোগে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রকল্পের উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী। উদ্বোধনের সঙ্গে সঙ্গেই প্রথম পর্যায়ের ৩৭ হাজার ৫৬৭ নারীপ্রধান পরিবারের বিকাশ অ্যাকাউন্টে ২,৫০০ টাকা করে সরাসরি জমা হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এটি মূলত পরীক্ষামূলক কর্মসূচি হিসেবে শুরু হলেও পর্যায়ক্রমে দেশের কোটি কোটি পরিবারকে এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
পাইলট প্রকল্প হিসেবে দেশের ১৪টি জেলার ১৩টি সিটি করপোরেশন বা ইউনিয়নের ১৫টি ওয়ার্ডে এই কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। প্রথম ধাপে ৩৭ হাজার ৫৬৭ জন নারীপ্রধান পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে ঢাকা-১৭ আসনের কড়াইল, সাততলা এবং ভাষাণটেক বস্তির প্রায় ১৫ হাজার নারী এই কার্ড পেয়েছেন। এছাড়া রাজধানীর মিরপুরের অলিমিয়ারটেক ও বাগানবাড়ী বস্তিতেও কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
ঢাকার বাইরে রাজবাড়ীর পাংশা, চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর, বান্দরবানের লামা, খুলনার খালিশপুর, ভোলার চরফ্যাশন, সুনামগঞ্জের দিরাই, কিশোরগঞ্জের ভৈরব, বগুড়া সদর, নাটোরের লালপুর, ঠাকুরগাঁও সদর এবং দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে একযোগে প্রকল্পের কার্যক্রম চালু করা হয়েছে।
এসব এলাকায় সরকারের মন্ত্রী ও দলের নেতারা স্থানীয় পর্যায়ে কার্ড বিতরণ কার্যক্রমে অংশ নেন।
উদ্বোধনের পরপরই নির্বাচিত নারীপ্রধান পরিবারগুলোর বিকাশ অ্যাকাউন্টে ২,৫০০ টাকা করে জমা হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত কয়েকজন নারী টাকা পাওয়ার পর তাদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন।
সরকারের মতে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে সরাসরি মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অর্থ প্রদান করা হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগী বা অনিয়মের সুযোগ কমে যায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী এবং এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে পিছনে রেখে দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তিনি বলেন, “আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি—যদি নারীদের শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।” তারেক রহমান আরও বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার আগেই নারীদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল এবং ফ্যামিলি কার্ড সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ।
তিনি অতীতের বিএনপি সরকারের সময়কার নীতির কথাও উল্লেখ করেন। তখন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে মেয়েদের জন্য স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষাকে বিনামূল্যে করা হয়েছিল বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু হওয়ার দিনটি তার জন্য ব্যক্তিগতভাবে আবেগঘন এবং দলের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন। তার ভাষায়, “বিগত কয়েক বছর ধরে আমরা পরিকল্পনা করেছি কীভাবে সুযোগ পেলে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবো। জনগণের সমর্থনে সরকার গঠন করার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে আমরা সেই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি—বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা—অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সরকার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থেকে সরে যাবে না বলেও আশ্বাস দেন।
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রায় চার কোটি পরিবারকে এই কর্মসূচির আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। বিশেষ করে নারীপ্রধান পরিবারগুলোর হাতে সরাসরি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে দারিদ্র্য হ্রাস এবং পরিবারভিত্তিক অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির পাশাপাশি সরকার কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ চালুর প্রস্তুতিও নিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, আগামী মাসের মধ্যেই কৃষকদের কাছে কৃষক কার্ড বিতরণ শুরু করা হবে। তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে কৃষকদের জন্য কৃষিঋণ মওকুফের প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অনুষ্ঠানে সমাজকল্যাণমন্ত্রী অধ্যাপক এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে একটি ‘সর্বজনীন সামাজিক পরিচয়পত্র’ হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
তার মতে, দলমত নির্বিশেষে দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ভবিষ্যতে এই কার্ডের সুবিধা পাবেন। তিনি বলেন, “ফ্যামিলি কার্ড শুধু একটি ভাতা কর্মসূচি নয়, ভবিষ্যতে এটি নাগরিকদের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় পরিচয়পত্রে পরিণত হতে পারে।”
সরকার জানিয়েছে, পরীক্ষামূলক পর্যায়ে চার মাসের জন্য ৩৮ কোটি ৭ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই সময়ের মধ্যে প্রকল্পের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করা হবে। সফল হলে এটি ধাপে ধাপে দেশের অন্যান্য এলাকায় সম্প্রসারণ করা হবে।
সরকার কিছু নির্দিষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ করেছে। যে পরিবারগুলো নিম্নলিখিত সুবিধা পায় বা সম্পদ রয়েছে, তারা এই ভাতা পাওয়ার জন্য অযোগ্য বলে বিবেচিত হবে: পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরি করলে, সরকারি বেতন, পেনশন বা অনুদান পেলে ,বড় ব্যবসা বা বাণিজ্যিক লাইসেন্স থাকলে , গাড়ি, এসি বা বিলাসবহুল সম্পদ থাকলে ,পাঁচ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র থাকলে
বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নগদ সহায়তা কর্মসূচি বর্তমানে অনেক দেশেই সামাজিক সুরক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে অর্থ প্রদান করলে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং দুর্নীতির ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে ডিজিটাল আর্থিক সেবার প্রসার হওয়ায় এমন কর্মসূচি বাস্তবায়ন তুলনামূলক সহজ হয়েছে।
তবে এই কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকারের সামনে কয়েকটি বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে—যেমন প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং দীর্ঘমেয়াদি টেকসই ব্যবস্থাপনা। যদিও সরকার আশাবাদী যে ধাপে ধাপে এই প্রকল্প সম্প্রসারণ করা সম্ভব হবে এবং তা দেশের সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন আনতে পারবে।
Leave a comment