নেপালের সাম্প্রতিক সাধারণ নির্বাচনের ভোট গণনা এখনও চলমান থাকলেও প্রাথমিক ফলাফলে এগিয়ে রয়েছেন সাবেক র্যাপার ও কাঠমান্ডুর সাবেক মেয়র বালেন্দ্র শাহ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারা অব্যাহত থাকলে দেশটির পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে তিনি শক্ত অবস্থানে থাকতে পারেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, শনিবার (৭ মার্চ) সকাল পর্যন্ত গণনা হওয়া ভোটের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বালেন্দ্র শাহের নেতৃত্বাধীন মধ্যপন্থী দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) ১৬৫টি নির্বাচিত আসনের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে এগিয়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক শক্তি নেপালি কংগ্রেস দ্বিতীয় অবস্থানে থাকলেও অনেকটা পিছিয়ে রয়েছে। তৃতীয় স্থানে রয়েছে কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপাল (ইউএমএল)।
বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে বালেন্দ্র শাহ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন নেপালের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী কেপি শর্মা ওলি এবং নেপালি কংগ্রেসের প্রভাবশালী নেতা গগন থাপা।
৭৪ বছর বয়সী কেপি শর্মা ওলি সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে ক্ষমতা হারালেও এবারও নির্বাচনে জয়ী হওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাস প্রকাশ করেছেন। তবে প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, তরুণ নেতৃত্বের প্রতি ভোটারদের আগ্রহ বেড়েছে।
বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের একটি বড় অংশ বালেন্দ্র শাহকে সমর্থন দিচ্ছেন বলে বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।
নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত আসনগুলোর একটি হলো ঝাপা–৫। এটি ঐতিহ্যগতভাবে কেপি শর্মা অলির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবে এবারের নির্বাচনে সেই আসনেই ওলির বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বালেন্দ্র শাহ। প্রাথমিক ভোট গণনায় দেখা যাচ্ছে, এই আসনে শাহ উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে আছেন। ফলে এই আসনের ফলাফলকে নেপালের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই আসনে শাহ জয়ী হন, তাহলে সেটি শুধু একটি নির্বাচনী জয় নয়, বরং নেপালের রাজনীতিতে নতুন প্রজন্মের উত্থানের প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
নেপালের নির্বাচন প্রক্রিয়ার একটি বৈশিষ্ট্য হলো ভোট গণনার ধীরগতি। পাহাড়ি ও দুর্গম ভূপ্রকৃতির কারণে অনেক সময় দূরবর্তী অঞ্চল থেকে ব্যালট বাক্স সংগ্রহ করতে হেলিকপ্টার ব্যবহার করতে হয়।
এ কারণে চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশে কয়েক দিন সময় লাগতে পারে। ২০২২ সালের সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনের চূড়ান্ত ফল প্রকাশ করতেও দুই সপ্তাহের বেশি সময় লেগেছিল। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারও সম্পূর্ণ ফলাফল প্রকাশ পেতে আগামী সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
৩৫ বছর বয়সী বালেন্দ্র শাহ, যিনি সাধারণত “বালেন” নামে পরিচিত, মূলত অবকাঠামো প্রকৌশলী হিসেবে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। রাজনীতিতে আসার আগে তিনি নেপালের হিপ-হপ অঙ্গনে সক্রিয় ছিলেন এবং ‘নেফপ’ নামে পরিচিত হিপ-হপ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
তিনি বেশ কয়েকটি গান প্রকাশ করেছেন, যেগুলোর অনেকগুলোই সামাজিক বার্তাধর্মী। তার জনপ্রিয় গান “বালিদান” ইউটিউবে মিলিয়ন ভিউ অর্জন করেছে।
মূলত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তার কারণে রাজনীতিতে তার উত্থান। গত বছর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিক্ষোভে তিনি প্রকাশ্যে বিক্ষোভকারীদের সমর্থন জানান। পরে সেই আন্দোলন দুর্নীতি, বেকারত্ব এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার বিরুদ্ধে বৃহত্তর প্রতিবাদে রূপ নেয়।
সেই বিক্ষোভে ৭৭ জন নিহত হন, যাদের অনেকেই পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারান। ওই ঘটনার পর রাজনৈতিক চাপের মুখে কেপি শর্মা ওলিকে পদত্যাগ করতে হয়।
যদিও তরুণদের মধ্যে বালেন্দ্র শাহ ব্যাপক জনপ্রিয়, তবে তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে।
সমালোচকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, দেশ পরিচালনার মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের জন্য তিনি কতটা প্রস্তুত।
কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি রাজধানীর রাস্তা পরিষ্কার রাখা এবং অবৈধ ব্যবসা দমনে কঠোর পদক্ষেপ নেন। এ সময় রাস্তার হকার ও ভূমিহীন মানুষের বিরুদ্ধে পুলিশি অভিযানের কারণে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মুখে পড়েন।
নির্বাচনী প্রচারণার সময় বালেন্দ্র শাহ গণমাধ্যমকে খুব বেশি সাক্ষাৎকার দেননি। এমনকি নির্বাচনের দিনও সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে যান। সেদিন কালো সানগ্লাস পরে সাংবাদিকদের ভিড় পেরিয়ে দ্রুত চলে যাওয়ার একটি দৃশ্য নেপালের গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। এতে অনেক গণমাধ্যম আশঙ্কা করছে, ক্ষমতায় গেলে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে দূরত্ব বজায় রাখতে পারেন।
তবে বিবিসির সঙ্গে কথা বলা অনেক তরুণ ভোটার বলছেন, দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় নতুন শক্তি ও উদ্যম প্রয়োজন। তাদের মতে, বালেন্দ্র শাহ সেই পরিবর্তনের প্রতীক হতে পারেন।
ভোট গণনা এখনও চলমান থাকায় চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশের আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। তবে প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এবারের নির্বাচন নেপালের রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে।
বিশেষ করে তরুণ নেতৃত্বের উত্থান এবং নতুন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব নেপালের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a comment