সিলেটের বালাগঞ্জে চাষাবাদযোগ্য কৃষিজমি ধ্বংস করে অবাধে মাটি কাটার মহোৎসব চলছে। ফসল উৎপাদনের উর্বর জমি থেকে প্রকাশ্যে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠলেও উপজেলা প্রশাসনের কার্যত কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। এতে দিনদিন সংকুচিত হচ্ছে আবাদি জমি, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশ ও গ্রামীণ অবকাঠামো। মাটিখেকো চক্র প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে অবৈধভাবে ফসলি জমির মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। অবাধে চলছে এই অবৈধ কর্মকাণ্ড। উপজেলার বিভিন্ন সড়কের মারাত্মক ক্ষতি করে সারাদিনই মাটিবোঝাই ট্রাক চলাচল করছে। বৃষ্টিপাত শুরু হলে এসব সড়কে কাদা জমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। শিশু ও বৃদ্ধরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষিজমি ও পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি দপ্তর বলছে, জমির উর্বরতার শক্তি ওপরের ১৫–২০ ইঞ্চি মাটির স্তরে থাকে। সেই ওপরের স্তরের মাটি সরিয়ে ফেলায় জমির উর্বরতা সম্পূর্ণভাবে বিনষ্ট হচ্ছে, যা ১০–১৫ বছরেও পূরণ হবে না।
জানা গেছে, বালাগঞ্জের এসিল্যান্ড জাকারিয়া হোসেন এখানে যোগদানের পর বলেছিলেন, মাটি কাটা রোধে তিনি কোনো আপস করবেন না। পেশিশক্তি বা কোনো প্রভাবের কাছে নতি স্বীকার করবেন না এবং প্রয়োজনে মাঠে তাবু টাঙিয়ে পাহারা দিয়ে হলেও মাটি কাটা বন্ধ করবেন। তবে তার বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যুক্ত মাটিখেকো চক্রের ভয়ে স্থানীয়রা প্রতিবাদ করতে পারছেন না। ওই চক্র এসিল্যান্ড ও ইউএনওকে ম্যানেজ করে অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। কখনও কখনও লোক দেখানো অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয় বলেও দাবি স্থানীয়দের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, উপজেলা প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সফিকুল ইসলামসহ প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তাকে প্রতিদিন ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দিচ্ছে মাটি কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি ঠিকাদারচক্র। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে উপজেলা পরিষদের ডিজিটাল সেবা কেন্দ্রে কর্মরত (উদ্যোক্তা) শাহজান নামের এক যুবক এই লেনদেনের ভাগবাটোয়ারার সঙ্গে জড়িত ছিলেন। যদিও বর্তমানে তিনি উপজেলা পরিষদের কোনো দায়িত্বে নেই, তবুও নিয়মিত অফিসে আসা-যাওয়া করেন এবং বিভিন্ন দপ্তরের ফাইলপত্র ও নথিপত্রে তাকে ঘাঁটাঘাঁটি করতে দেখা যায় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পহেলা মার্চ মাটি কাটার বিষয়ে তথ্য জানতে চাইলে এক সাংবাদিককে এসিল্যান্ড ক্ষুব্ধ ভঙ্গিতে কথা বলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তথ্য চাওয়ার পর এক ঠিকাদারকে ওই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে উসকে দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন সাংবাদিক। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এসিল্যান্ড জাকারিয়া হোসেন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তিনি বলেন, নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় হয়তো দু-এক জায়গায় মাটি কাটা হয়ে থাকতে পারে, বর্তমানে তা বন্ধ রয়েছে।
বালাগঞ্জ ইউনিয়নের এক ভুক্তভোগী জানান, গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর মাটি কেটে বিক্রির উদ্দেশ্যে শ্রমিকসহ দুটি ট্রলি ভাড়া করেছিলেন। সেদিন থানা পুলিশ উৎকোচ দাবি করে বলে তিনি অভিযোগ করেন। মাটি কাটতে না পেরে সারাদিন গাড়ি ও শ্রমিক বসিয়ে রাখতে হয়, এতে তার ৩০ হাজার টাকা ক্ষতি হয়। পরদিন ট্রলিগুলো অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার সময় একজন ড্রাইভারকে এসিল্যান্ডের সঙ্গে থাকা পুলিশ সদস্যরা গাড়িতে তুলে নিয়ে যান। পরে অফিসে আটকে রেখে তার কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। জরিমানার টাকা না দিলে মামলা দিয়ে জেলে পাঠানোর হুমকি দেওয়া হয় বলেও দাবি করেন ওই ব্যক্তি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় শতাধিক স্থানে আবাদযোগ্য কৃষিজমি থেকে এক্সকাভেটর বা ভেকু দিয়ে মাটি কাটা হচ্ছে। ইতোমধ্যে সহস্রাধিক বাড়িঘরের ভিটা ভরাট করা হয়েছে। বর্তমানে বালাগঞ্জ ইউনিয়নের হাসামপুর, গৌরীনাথপুর, আদিত্যপুর, গহরমলি, পূর্ব পৈলনপুর ইউনিয়নের জালালপুর, বোয়ালজুড় ইউনিয়নের বুরবুরি, চান্দাইরপাড়া, বাণিগাঁও, হুঁশিয়ারপুর, পূর্ব গৌরীপুর ইউনিয়নের ওসমানীগঞ্জ বাজার, পশ্চিম গৌরীপুর ইউনিয়নের নলজুর, আজিজপুর, সারসপুর এবং দেওয়ানবাজার ইউনিয়নের জামালপুর ও সুলতানপুর গ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় ফসলি জমির মাটি কাটা হচ্ছে। শ্রমিকরা জানান, বসতভিটা ভরাট ও স্থাপনা নির্মাণের কাজে এসব মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসানের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও অভিযোগ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তিনি বলেন, সঠিক তথ্য বা লিখিত অভিযোগ কেউ দিচ্ছেন না; অভিযোগ পেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a comment