এমরান হোসেন, জামালপুর | নদনদী বেষ্টিত জামালপুর জেলার বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে বসবাসকারী মানুষের জীবন যেন এক অন্তহীন সংগ্রামের নাম। ব্রহ্মপুত্র ও যমুনা নদীর প্রবল স্রোত, প্রতিবছরের বন্যা ও ভয়াবহ নদীভাঙনে ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন হাজারো পরিবার। জীবিকার নিশ্চয়তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নিরাপদ বাসস্থানের মতো মৌলিক অধিকার থেকেও দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত এসব মানুষ। ফলে জীবনের তাগিদে অনেকেই বাধ্য হচ্ছেন এলাকা ছেড়ে অন্যত্র পাড়ি জমাতে।
জামালপুর জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত ব্রহ্মপুত্র, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, ঝিনাই, দশানী, জিঞ্জিরাম, আলাই ও মরা জিঞ্জিরাম নদীর কারণে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য চর। জেলার দেওয়ানগঞ্জ, বকশীগঞ্জ, সরিষাবাড়ী, মাদারগঞ্জ ও সদরসহ বিভিন্ন উপজেলায় প্রতি বছরই বন্যা ও নদীভাঙনের ভয়াল চিত্র দেখা যায়। বন্যার সময় যমুনা ও ব্রহ্মপুত্র তীরবর্তী এলাকার লক্ষাধিক মানুষ কয়েক সপ্তাহ ধরে পানিবন্দী অবস্থায় মানবেতর জীবনযাপন করেন। আবার পানি নামার পর শুরু হয় নদীভাঙনের তাণ্ডব, যা কেড়ে নেয় মানুষের শেষ সম্বলটুকুও।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যালয়ের তথ্যমতে, ২০২০ সালের ভয়াবহ বন্যায় জেলার সাতটি উপজেলার ৬৮টি ইউনিয়নের মধ্যে ৪৬টি প্লাবিত হয়। আটটি পৌরসভার মধ্যে চারটি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় পাঁচ লাখ আটানব্বই হাজারের বেশি মানুষ পানিবন্দী হয়ে পড়েন। এতে পঞ্চাশটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও পঁচিশটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং পনেরো হাজারের বেশি হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় একশ চল্লিশ কোটি টাকা, আর ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোগত ক্ষতিসহ মোট ক্ষতির পরিমাণ প্রায় তিনশ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।
গত কয়েক দশকে ইসলামপুর, মাদারগঞ্জ, সরিষাবাড়ী ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলার নদীতীরবর্তী অন্তত পনেরোটি ইউনিয়নের অর্ধশতাধিক গ্রামের বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এতে প্রায় বিশ হাজার পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়েছে। নদীগর্ভে হারিয়ে গেছে বহু পুরোনো বাজার, সড়ক, মসজিদ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়ে ঝরে পড়ছে অসংখ্য শিক্ষার্থী।
চরাঞ্চলের মানুষের দুর্ভোগ কেবল বন্যা ও ভাঙনেই সীমাবদ্ধ নয়। শুষ্ক মৌসুমে তীব্র খরার কারণে পানির সংকট দেখা দেয়, কৃষিকাজে নেমে আসে স্থবিরতা। যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া এখানে একপ্রকার বিলাসিতা। অসুস্থ হলেও অনেক সময় চিকিৎসা নেওয়ার সুযোগ পান না তারা। ফলে সাধারণ রোগব্যাধিও মারাত্মক রূপ নেয়।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলের উন্নয়নে কার্যকর কোনো পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে যুগের পর যুগ প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে হচ্ছে তাদের। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সম্প্রসারণসহ বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ ও দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে বদলে যেতে পারে জামালপুরের চরাঞ্চলের মানুষের জীবনমান।
Leave a comment