আগুনে দগ্ধ সৌদি আরবপ্রবাসী মীর ইব্রাহিমের চিকিৎসা ব্যয় বহনের আশ্বাস দিয়ে পরে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সহযোগিতা না করা, তাঁর নামে অনুমতি ছাড়া অনুদান সংগ্রহ এবং অনুদানের হিসাব না দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগ তুলে বিষয়টি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তিনি।
তবে এ অভিযোগের বিষয়ে মাস্তুল ফাউন্ডেশনের বক্তব্য জানা যায়নি। তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে কর্মরত অবস্থায় অগ্নিদগ্ধ হন মীর ইব্রাহিম। পরে তাঁকে দেশে আনা হয়। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁর প্রয়োজন ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা। কিন্তু একজন প্রবাসী শ্রমিকের পরিবারের পক্ষে এত অর্থ জোগাড় করা সম্ভব হচ্ছিল না।
এ অবস্থায় মানবিক বিষয়বস্তু নির্মাতা জুয়েল নামের এক ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইব্রাহিমের চিকিৎসার জন্য সহায়তার আবেদন জানান। ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিভিন্ন ব্যক্তি তাঁর চিকিৎসায় সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসেন।
এর কিছুদিন পর পরিচিত এক ব্যক্তির মাধ্যমে মীর ইব্রাহিমের সাক্ষাৎ হয় প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নূরের সঙ্গে। সেখানে সরকারি তহবিল থেকে সম্ভাব্য সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে দাবি করেন ইব্রাহিম।
মীর ইব্রাহিমের অভিযোগ, ওই বৈঠকেই মাস্তুল ফাউন্ডেশনের দুই প্রতিনিধি তাঁর সম্পূর্ণ চিকিৎসা ব্যয় বহনের আগ্রহ প্রকাশ করেন। পরে তাঁকে নিয়ে একাধিক ভিডিও ধারণ করা হয় এবং সেগুলো ফাউন্ডেশনের বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজে প্রকাশ করা হয়।
ইব্রাহিমের দাবি, এসব ভিডিওতে ব্যাপক সাড়া মিললেও অনুদানের অর্থ সম্পর্কে তাঁকে কোনো তথ্য জানানো হয়নি। তাঁর অভিযোগ, চিকিৎসার প্রকৃত ব্যয় ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা হলেও মাস্তুল ফাউন্ডেশনের কয়েকটি পোস্টে ১ কোটি ১০ লাখ টাকা প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়। বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠার পর সংশ্লিষ্ট পোস্টের ক্যাপশন পরিবর্তন বা সরিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি তাঁর।
আরও অভিযোগ করে মীর ইব্রাহিম বলেন, তাঁর অনুমতি ছাড়াই ফাউন্ডেশন নিজেদের ব্যাংক হিসাব ও মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অনুদান সংগ্রহ শুরু করে। তবে কত টাকা সংগ্রহ হয়েছে কিংবা কীভাবে সেই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁকে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
ইব্রাহিমের ভাষ্য, ভিডিওগুলো ভাইরাল হওয়ার পর তিনি অনুদানের বিষয়ে জানতে চাইলে তাঁকে জানানো হয়, তাঁর জন্য প্রায় ৩০ হাজার টাকা এসেছে এবং পরে এক লাখ টাকার কিছু বেশি দেওয়া হবে। এতে তিনি বিস্মিত হন।
তিনি বলেন, “আমাকে বলা হয়েছিল আমার সম্পূর্ণ চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়া হবে। আমাকে দিয়ে ভিডিও বানিয়ে কোটি মানুষের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। যদি আমার নামে অনুদান সংগ্রহ হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থের স্বচ্ছ হিসাব আমি কেন পাব না? আমি শুধু আমার ন্যায্য প্রাপ্য চাই।”
পরে বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে ফেস দ্য পিপল। এর পরবর্তী সময়ে প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিতিতে মাস্তুল ফাউন্ডেশন মীর ইব্রাহিমের হাতে ১০ লাখ টাকার একটি চেক তুলে দেয়।
তবে ইব্রাহিমের দাবি, এই অর্থ তাঁর চিকিৎসার জন্য যথেষ্ট নয় এবং শুরুতে দেওয়া প্রতিশ্রুতির সঙ্গে এর মিল নেই।
এদিকে চিকিৎসকদের মতে, মীর ইব্রাহিমের বর্তমান শারীরিক অবস্থা গুরুতর। তাঁকে সুস্থ করতে ভারতের চেন্নাইয়ে অন্তত দুটি বড় অস্ত্রোপচার প্রয়োজন। সময়মতো চিকিৎসা না হলে তাঁর শারীরিক জটিলতা আরও বাড়তে পারে।
ঘটনাটি ঘিরে কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে। চিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বহনের আশ্বাস দিয়ে পরে কেন ১০ লাখ টাকায় সহায়তা সীমাবদ্ধ রাখা হলো? চিকিৎসার প্রয়োজন ৪৫ থেকে ৫০ লাখ টাকা হলেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কেন ১ কোটি ১০ লাখ টাকার আবেদন প্রকাশ করা হয়েছিল? রোগীর অনুমতি ছাড়া তাঁর নামে অনুদান সংগ্রহ করা হয়ে থাকলে তার আইনি ও নৈতিক ভিত্তি কী? আর অনুদান হিসেবে কত টাকা সংগ্রহ হয়েছে এবং সেই অর্থের পূর্ণাঙ্গ হিসাব কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর এবং অভিযোগগুলোর সত্যতা নিরূপণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও অনুদানের অর্থের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন মীর ইব্রাহিম ও তাঁর পরিবার।
অন্যদিকে, বিতর্কের মধ্যেও চিকিৎসার অপেক্ষায় রয়েছেন মীর ইব্রাহিম। পরিবারের দাবি, দ্রুত প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার নিশ্চিত না হলে তাঁর জীবন আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
Leave a comment