বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার কেন্দ্রে থাকা সরকারপ্রধানের জন্য সম্পূর্ণ নতুন এবং সর্বাধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত একটি স্থায়ী বাসভবন নির্মাণের মহাপরিকল্পনা হাতে নিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার পরবর্তী নতুন প্রশাসন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন ‘গণভবন’কে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ হিসেবে ঘোষণা করায় তৈরি হয়েছে এই আবশ্যিকতা। আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতাধর রাষ্ট্রনায়কদের বাসভবনের আদলে নিরাপত্তা ও আভিজাত্যের মিশেলে এই ভবনটি নির্মাণের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, নতুন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের জন্য রাজধানীর অভিজাত এবং প্রশাসনিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা মিন্টো রোড, হেয়ার রোড অথবা বেইলী রোডকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে সচিবালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং জাতীয় সংসদ ভবনের সঙ্গে যাতায়াতের সুবিধাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। পিডব্লিউডি বা গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে উপযুক্ত জমি নির্বাচনের জন্য। প্রাথমিক তথ্যানুযায়ী, মিন্টো রোড বা হেয়ার রোডের বর্তমান সরকারি ৫-৬টি পুরনো ভবন বা বাংলো অধিগ্রহণ করে একটি বৃহৎ এলাকা জুড়ে এই নতুন কমপ্লেক্স তৈরি করার পরিকল্পনা রয়েছে।
নতুন এই বাসভবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হতে যাচ্ছে এর নিরাপত্তা ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাপী অস্থির ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ঝুঁকি মাথায় রেখে মাটির নিচে তৈরি করা হবে অত্যাধুনিক বাংকার এবং গোপন সুড়ঙ্গ বা টানেল। গণপূর্ত অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রপ্রধানদের নিরাপত্তা প্রটোকল অনুসরণ করেই এই নকশা চূড়ান্ত করা হচ্ছে।
বোমা হামলা বা আকাশপথের কোনো সম্ভাব্য আক্রমণ থেকে সরকারপ্রধান ও তাঁর পরিবারকে সুরক্ষিত রাখতে এই আন্ডারগ্রাউন্ড বাংকার হবে একটি ‘অভেদ্য দুর্গ’। এছাড়া জরুরি প্রয়োজনে বাসভবন থেকে নিরাপদে বের হয়ে যাওয়ার জন্য বা নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানোর জন্য থাকবে বিশেষ টানেল। উন্নত বিশ্বের বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস বা অন্যান্য শক্তিশালী দেশের সরকারপ্রধানদের বাসভবনের নিরাপত্তার মানদণ্ড এখানে অনুসরণ করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য যে, জুলাই বিপ্লবের পর সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন গণভবন জনরোষের মুখে পড়ে এবং পরবর্তীতে এটিকে স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাতে অবস্থান করলেও, নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত বাসভবন থেকেই আপাতত দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনাকে আপাতত বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান এবং বিদেশি প্রতিনিধিদের সঙ্গে সাক্ষাতের স্থান হিসেবে ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তার ব্যক্তিগত বাসভবনে থাকায় এবং স্থায়ী কোনো বাসভবন না থাকায় প্রশাসনিক কাজে কিছুটা সীমাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এই পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে স্থায়ী বাসভবন নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পরিকল্পনা ও উন্নয়ন) মো. আব্দুল মতিন জানান, “একটি দেশের সরকারপ্রধানের জন্য স্থায়ী এবং নিরাপদ আবাসন রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। প্রধানমন্ত্রীর পছন্দ অনুযায়ী মিন্টো রোড বা হেয়ার রোড এলাকাতেই এটি নির্মাণের প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমরা স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতির সঙ্গে সমন্বয় করে এর নকশা প্রণয়ন করছি।”
ভবনটির নকশায় আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর পাশাপাশি বাংলাদেশের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের প্রতিফলন রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। তবে মূল ফোকাস থাকবে ‘সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি’র ওপর। সচিবালয়কেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে বিশেষ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট এবং সিকিউরিটি করিডোর তৈরির বিষয়গুলোও পরিকল্পনার অংশ।
প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন নির্মাণের প্রক্রিয়া শুরু হলেও, ইতিমধ্যে নতুন মন্ত্রিসভার সদস্য এবং প্রতিমন্ত্রীদের জন্য মিন্টো রোড, বেইলী রোড এবং ধানমন্ডি এলাকার সরকারি বাংলো বরাদ্দ কার্যক্রম শেষ হয়েছে। অধিকাংশ মন্ত্রী ইতিমধ্যে তাদের নির্ধারিত সরকারি বাসভবনে উঠেছেন এবং অনেকের বাসার সংস্কার কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। এছাড়া হেয়ার রোডে অবস্থিত ‘মিনিস্টার্স অ্যাপার্টমেন্ট’-এর আধুনিক ফ্ল্যাটগুলোও ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক ইতিহাসে নতুন প্রধানমন্ত্রীর এই বাসভবনটি শুধু একটি ভবন নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। আধুনিক প্রযুক্তি, ভূগর্ভস্থ নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং কৌশলগত অবস্থান—সব মিলিয়ে এটি হবে একটি সম্পূর্ণ সুরক্ষিত প্রশাসনিক কেন্দ্র। গণপূর্ত বিভাগ আশা করছে, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নকশা চূড়ান্ত করে নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হবে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও সুসংহত করবে।
Leave a comment