বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়েছে প্রার্থীদের নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। নির্বাচন কমিশন (ইসি) স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, নির্ধারিত সময়ের পর কোনো প্রার্থী বা তার সমর্থক নির্বাচনী প্রচারণায় জড়িত হলে তা গুরুতর বিধি লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে, যার পরিণতিতে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল পর্যন্ত হতে পারে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত ২২ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রচারণা শুরু হয়েছিল। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে সব ধরনের প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সেই হিসাবে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার সঙ্গে সঙ্গেই প্রচার-প্রচারণার সময়সীমা শেষ হয়।
এরপর ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় কোনো ধরনের জনসভা, মিছিল বা শোভাযাত্রা আয়োজন করা যাবে না বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসি জানায়, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ অনুযায়ী ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর থাকবে। অর্থাৎ ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত নির্বাচনী এলাকায় জনসমাবেশ নিষিদ্ধ থাকবে।
এছাড়া নির্বাচনী আচরণ বিধি অনুযায়ী, ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে প্রার্থীদের নিজ নিজ প্রচারণা সামগ্রী—যেমন পোস্টার, ব্যানার ও ফেস্টুন—নিজ দায়িত্বে অপসারণ করতে হবে। এতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে বলে ইসি সূত্র জানিয়েছে।
প্রচার শেষ হওয়ার আগের দিন সোমবার বিভিন্ন এলাকায় ব্যস্ত সময় পার করেন প্রার্থীরা। শেষ সুযোগ কাজে লাগাতে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে ভোট চান তারা। অনেক এলাকায় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের রাতভর গণসংযোগ করতে দেখা গেছে। বিশেষ করে বাজার, লঞ্চঘাট, বাস টার্মিনালসহ রাতের বেলা জনসমাগম বেশি হয়—এমন এলাকাগুলোতে প্রচারণা ছিল চোখে পড়ার মতো।
কিছু এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা কেন্দ্রগুলোও সারারাত খোলা ছিল। এমনকি ফজরের নামাজের পরও অনেক প্রার্থী ভোট চাইতে বের হন। তবে মঙ্গলবার সকাল সাড়ে সাতটার পর এসব কার্যক্রম বন্ধ করার নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন।
প্রচার শেষ হওয়ার আগে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের ভাষণও প্রচারিত হয়। সোমবার সন্ধ্যার পর বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে ভাষণ দেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এবারের নির্বাচনের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দল হিসেবে বিবেচিত এই দুই দলের শীর্ষ নেতা নিজ নিজ দলের পক্ষে ভোট চান।
এর আগের দিন রোববার একইভাবে ভাষণ দেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মামুনুল হক।
প্রচার-প্রচারণা শেষ হওয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে ভোটের ক্ষণ গণনা। আগামী বৃহস্পতিবার সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একইসঙ্গে গণভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ কারণে আগের নির্বাচনগুলোর তুলনায় এবার ভোটগ্রহণের সময় এক ঘণ্টা বাড়ানো হয়েছে।
নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে একটানা চলবে বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত। সেদিন দেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে একযোগে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। শেরপুর-৩ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থীর মৃত্যুর কারণে ওই আসনের নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। সেখানে পরবর্তী সময়ে ভোটগ্রহণ হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর এবারই প্রথম জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত ৫৯টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে এবার ৫১টি দল নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।
এই নির্বাচনে মোট প্রায় দুই হাজার প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদের মধ্যে আড়াইশ’র বেশি স্বতন্ত্র প্রার্থী রয়েছেন, যা ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা আরও বৈচিত্র্যময় করেছে।
ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পর প্রতি দুই ঘণ্টা পরপর নির্বাচনী পরিবেশ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোট প্রদানের হার সম্পর্কে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করবে নির্বাচন কমিশন। এই কার্যক্রম ভোটের দিন সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বেসরকারি ফলাফল পাওয়া পর্যন্ত চলবে বলে ইসি জানিয়েছে।
এদিকে, সমালোচনার মুখে ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসেছে নির্বাচন কমিশন। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ভোটার, প্রার্থী, তাদের এজেন্ট, সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকরা ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন সঙ্গে রাখতে পারবেন। তবে গোপন কক্ষ বা ব্যালট স্ট্যাম্পিং রুমে মোবাইল ফোন বহন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে।
নির্বাচনকে প্রভাবমুক্ত ও শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচনী এলাকায় বহিরাগতদের অবস্থানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ইসির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নির্বাচনী কার্যক্রমে সম্পৃক্ত ব্যক্তি, কমিশনের অনুমতিপ্রাপ্ত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা বা ভোটার ছাড়া অন্য কেউ ভোটগ্রহণ শুরুর ৪৮ ঘণ্টা আগে থেকে ভোটগ্রহণ শেষের ২৪ ঘণ্টা পর পর্যন্ত ওই এলাকায় অবস্থান করতে পারবেন না।
এই নিষেধাজ্ঞা ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি বিকেল সাড়ে চারটা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। এ বিষয়ে সারাদেশের পুলিশ কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচন কমিশনের মতে, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ, সুশৃঙ্খল ও বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
Leave a comment