আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঢাকা-১১ আসনে রাজনৈতিক উত্তাপ আরও বেড়েছে। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক মো. নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন করা হয়েছে। এই আবেদন ঘিরে নির্বাচনী রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্ক ও আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) ঢাকা-১১ আসনের জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী শামীম আহমেদ এই রিট দায়ের করেন। আবেদনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি), নির্বাচন কমিশনের সচিব, সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং অফিসার এবং প্রার্থী নাহিদ ইসলামকে বিবাদী করা হয়েছে। আইনজীবী সূত্রে জানা গেছে, বিচারপতি ফাতেমা নজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে এ রিটের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হতে পারে।
রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, মো. নাহিদ ইসলাম ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল ক্যারিবীয় রাষ্ট্র ডোমিনিকার নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের সংবিধান ও বিদ্যমান নির্বাচনী আইনের আলোকে দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা থাকে না—এমন যুক্তি তুলে ধরে তার মনোনয়ন বাতিলের আবেদন জানানো হয়েছে।
আবেদনকারী শামীম আহমেদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নাহিদ ইসলাম নাগরিকত্ব সংক্রান্ত তথ্য গোপন করে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছেন, যা নির্বাচনী আইনের লঙ্ঘন। বিষয়টি প্রমাণিত হলে তার প্রার্থিতা আইনগতভাবে অবৈধ হয়ে পড়বে বলে রিটে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই রিটের প্রেক্ষাপট আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে নাহিদ ইসলামের সাম্প্রতিক আইনি পদক্ষেপগুলোর কারণে। এর আগে তিনি নিজেই ঢাকা-১১ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এম এ কাইয়ুমের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেছিলেন। তবে সেই আবেদন খারিজ হয়ে যায়। পরে নাহিদ ইসলাম আপিল বিভাগের চেম্বার জজ আদালতে পুনরায় আবেদন করেন। এখন তার বিরুদ্ধেই প্রার্থিতা বাতিলের রিট হওয়ায় নির্বাচনী লড়াইয়ে, আইনি পাল্টাপাল্টি অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
নাহিদ ইসলাম ঢাকা-১১ আসন থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ২১, ২২, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০, ৪১ ও ৪২ নম্বর ওয়ার্ড এবং সবুজবাগ এলাকার ২৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এই আসনটি রাজধানীর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও জনবহুল এলাকা হিসেবে পরিচিত।
নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-১১ আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৭৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৮৭৭ জন এবং নারী ভোটার ২ লাখ ১৬ হাজার ১৯৮ জন। পাশাপাশি এই আসনে তৃতীয় লিঙ্গের তিনজন ভোটারও রয়েছেন। ভোটারদের এই বৈচিত্র্য ও সংখ্যার কারণে আসনটিকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন একাধিক রাজনৈতিক দলের প্রার্থী। নাহিদ ইসলাম ছাড়াও বিএনপির এম এ কাইয়ুম, স্বতন্ত্র প্রার্থী কহিনূর আক্তার বীথি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তিজোটের কাজী মো. শহীদুল্লাহ, গণফোরামের মো. আবদুল কাদের, গণঅধিকার পরিষদের মো. আরিফুর রহমান, বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টির মো. জাকির হোসেন, ন্যাশনাল পিপলস্ পার্টির মো. মিজানুর রহমান, জাতীয় পার্টির শামীম আহমেদ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শেখ মো. ফজলে বারী মাসউদ নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যদি আদালত প্রাথমিকভাবে রিটটি গ্রহণ করে এবং অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেন, তাহলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত না হলে রিটটি খারিজ হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকা-১১ আসনে ইতোমধ্যেই বহুমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে আইনি লড়াই যুক্ত হওয়ায় এই আসনের নির্বাচন আরও আলোচিত ও সংবেদনশীল হয়ে উঠছে।
সব মিলিয়ে, দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা বাতিল চেয়ে করা এই রিট শুধু আদালতের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা একটি আইনি প্রক্রিয়া নয়; এটি আসন্ন নির্বাচনে প্রার্থীর যোগ্যতা, আইন মান্যতা এবং রাজনৈতিক নৈতিকতা নিয়ে চলমান জাতীয় বিতর্কেরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
Leave a comment