নরসিংদীর মাধবদীতে ১৫ বছর বয়সী কিশোরী আমেনা আক্তারকে অপহরণের পর হত্যা মামলায় নতুন করে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। পূর্বের সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ অর্থের বিনিময়ে মীমাংসার চেষ্টা এবং আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগে স্থানীয় সাবেক ইউপি সদস্য ও মহিষাশুড়া ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আহম্মদ আলী দেওয়ানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় তার ছেলে ইমরান দেওয়ানসহ এজাহারভুক্ত মোট পাঁচজনকে আটক করা হয়েছে।
পুলিশ ও মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫ দিন আগে স্থানীয়ভাবে বখাটে হিসেবে পরিচিত নূরার নেতৃত্বে পাঁচ-ছয়জন তরুণ আমেনাকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ করে—এমন অভিযোগ রয়েছে পরিবারের। ঘটনার পর বিচার চেয়ে পরিবারটি স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তি আহম্মদ আলী দেওয়ানের শরণাপন্ন হয়।
পরিবারের অভিযোগ, প্রথমে বিচার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে আইনি ব্যবস্থা না নিতে চাপ দেওয়া হয়। বিষয়টি নিজের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করেন আহম্মদ আলী দেওয়ান। অভিযোগ রয়েছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে রফাদফা করে মোটা অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করা হয় এবং ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়া হয়। এমনকি ভুক্তভোগী পরিবারকে গ্রাম ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি স্বজনদের।
মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন জানান, গ্রেপ্তারকৃত মো. এবাদুল্লাহ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেছেন যে, পূর্বের ধর্ষণের ঘটনা মীমাংসার নামে ধামাচাপা দিতে আহম্মদ আলী দেওয়ানকে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে আইনি প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত করার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ায় তাকে ও তার ছেলেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, প্রথম ঘটনার কোনো বিচার না হওয়ায় অভিযুক্তরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। নিহতের বাবার ভাষ্য অনুযায়ী, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রাত ৯টার দিকে তিনি মেয়েকে খালার বাড়িতে রেখে আসতে যাচ্ছিলেন। সদর উপজেলার মাধবদী থানার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের বিলপাড় এলাকায় পৌঁছালে নূরার নেতৃত্বে ছয় তরুণ তার সামনে থেকেই কিশোরীকে জোরপূর্বক তুলে নিয়ে যায়।
রাতভর বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাওয়া যায়নি। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৯টা থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার মধ্যে বিলপাড় ও দড়িকান্দী এলাকার মাঝামাঝি কোতয়ালীরচর গ্রামের একটি সরিষা ক্ষেতে স্থানীয়রা মরদেহ দেখতে পেয়ে পুলিশে খবর দেন।
খবর পেয়ে মাধবদী থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে মরদেহ উদ্ধার করে। সুরতহাল প্রতিবেদন শেষে লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নরসিংদী সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেলে মৃত্যুর সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত আমেনা আক্তার মহিষাশুড়া ইউনিয়নের একটি এলাকায় ভাড়া বাসায় বাবা, মা ও ভাইয়ের সঙ্গে বসবাস করতেন। তার বাবা ও ভাই স্থানীয় একটি টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। গ্রামের বাড়ি বরিশালে।
এ ঘটনায় নয়জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। নিহতের মা বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতে মাধবদী থানায় মামলা করেন। এজাহারভুক্ত যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা হলেন—আহম্মদ আলী দেওয়ান (৬৫), তার ছেলে ইমরান দেওয়ান (৩২), মো. এবাদুল্লাহ (৩৫), আইয়ুব আলী (৩০) ও মো. গাফফার (৩৭)। প্রধান আসামি নূরাকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
ওসি কামাল হোসেন বলেন, “মামলার এজাহারভুক্ত পাঁচজনকে ইতোমধ্যে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রধান আসামিসহ বাকিদের ধরতে পুলিশ ও অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যৌথভাবে কাজ করছে। দ্রুতই তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।”
সদর আসনের সংসদ সদস্য খায়রুল কবির (খোকন) এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডে সকল অপরাধীকে গ্রেপ্তারের মাধ্যমে নিহত কিশোরীর পরিবারের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে। একজন অপরাধীকেও ছাড় দেওয়া হবে না।”
Leave a comment