দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে সীমান্তে আবারও প্রচারমূলক লাউডস্পিকার চালুর ঘোষণা দিয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং–উনের বোন কিম ইয়ো জং। একই সঙ্গে উত্তর কোরিয়ার অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখলে দক্ষিণ কোরিয়াকে ‘সবচেয়ে ভয়াবহ ও যন্ত্রণাদায়ক পরিস্থিতির’ মুখোমুখি হতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দেওয়া এক বিবৃতিতে কিম ইয়ো জং বলেন, অক্টোবরের শেষ নাগাদ সীমান্তজুড়ে দক্ষিণ কোরিয়াবিরোধী লাউডস্পিকার চালু করা হবে। এর আগে বুধবার রাতে জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত এলাকার সামরিক স্থাপনা ও প্রতিরক্ষাব্যবস্থা পরিদর্শন করেন তিনি।
কিম ইয়ো জংয়ের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়ার কৌশলগত সামরিক ইউনিটগুলো সীমান্তে নতুন অবস্থান নিয়েছে। এ ছাড়া দক্ষিণ কোরিয়ার সেনারা সীমান্ত এলাকায় উসকানিমূলক বার্তা প্রচার এবং কয়েকটি স্থানে সতর্কতামূলক গুলি ছুড়েছে।
সতর্কতামূলক গুলির বিষয়ে কিম ইয়ো জং বলেন, দক্ষিণ কোরিয়ার এমন পদক্ষেপে উত্তর কোরিয়ার ভূখণ্ড বা কোনো সেনাসদস্য ক্ষতিগ্রস্ত হলে পিয়ংইয়ংয়ের বাহিনী ‘বিনা দ্বিধায় ও নির্মমভাবে’ জবাব দেবে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে উত্তর কোরিয়ার পক্ষ থেকে বিস্তারিত প্রমাণের কথা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিক্রিয়া
দক্ষিণ কোরিয়া তাদের পদক্ষেপকে আইনসম্মত ও আত্মরক্ষামূলক বলে বর্ণনা করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা ও একীভূতকরণ মন্ত্রণালয় উত্তর কোরিয়াকে আলোচনার টেবিলে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
দক্ষিণ কোরিয়ার সামরিক বাহিনীর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, জাতিসংঘ কমান্ডের সহায়তায় অসামরিকীকৃত অঞ্চলে (ডিএমজেড) নিয়ন্ত্রণ জোরদার করার উদ্যোগ নিয়েছে সিউল। উত্তর কোরিয়ার প্রতিক্রিয়াকে ওই উদ্যোগের কার্যকারিতার ইঙ্গিত হিসেবে দেখছে দেশটি।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, উত্তর কোরিয়া হুমকি বাস্তবায়ন করলে সিউলও সমানুপাতিক ও উপযুক্ত জবাব দেবে।
কিম ইয়ো জংয়ের এই হুঁশিয়ারি দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টাকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে। ২০২৫ সালের জুনে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে লি দুই কোরিয়ার মধ্যে আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।
প্রচারযুদ্ধের দীর্ঘ ইতিহাস
১৯৫০ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত চলা কোরীয় যুদ্ধের অবসান ঘটে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে। তবে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক শান্তিচুক্তি হয়নি। এরপর থেকে দুই কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে। সীমান্তে প্রচার চালানোর জন্য দুই দেশই বিভিন্ন সময়ে শক্তিশালী লাউডস্পিকার ব্যবহার করেছে।
দক্ষিণ কোরিয়া এসব লাউডস্পিকারে জনপ্রিয় কে-পপ গান, সংবাদ ও উত্তর কোরিয়াবিরোধী বার্তা প্রচার করত। এতে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানাত পিয়ংইয়ং।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর লি জে-মিয়ং দুই দেশের মধ্যে আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে সীমান্তে লাউডস্পিকারে প্রচার বন্ধের নির্দেশ দেন। পরে এসব লাউডস্পিকার সরিয়ে নেওয়া হয়। এর জবাবে উত্তর কোরিয়াও সীমান্তে প্রচার বন্ধ রেখেছিল।
তবে ২০২৪ সাল থেকে উত্তর কোরিয়া সীমান্ত এলাকায় প্রতিরক্ষাব্যবস্থা জোরদার, মাইন স্থাপন এবং কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের মতো বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সম্প্রতি সীমান্ত এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে দক্ষিণ কোরিয়ার দুই সেনা গুরুতর আহত হন। এ ঘটনার জন্য পিয়ংইয়ংকে দায়ী করে সিউল। তবে উত্তর কোরিয়া অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ‘বানানো গল্প’ বলে অভিহিত করে।
দক্ষিণ কোরিয়ার কিউংনাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লিম উল-চুলের মতে, কিম ইয়ো জংয়ের হুঁশিয়ারির অর্থ এই নয় যে অবিলম্বে লাউডস্পিকার চালু করা হবে। তবে এ ঘোষণা দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট লি জে-মিয়ংয়ের প্রশাসনের সামনে রাজনৈতিক ও সামরিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
সূত্র: জাপান টাইমস।
Leave a comment