ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনের পর সরকার গঠনের প্রস্তুতি জোরদার করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম রাজনৈতিক অঙ্গনে জোরালোভাবে আলোচিত হচ্ছে। দলটির গুলশান কার্যালয়ের একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতির পদে তাকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং শিগগিরই এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
নির্বাচনে জয়লাভের পর মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থাভাজন হিসেবে তার নাম সামনে আসা অপ্রত্যাশিত নয়। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। ফলে নতুন সরকার গঠনের প্রাক্কালে রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, আগামী ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যদের শপথ পড়াবেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দীন। বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ওই শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন। এ প্রেক্ষাপটে রাষ্ট্রপতি পদে সম্ভাব্য নিয়োগ নিয়ে আলোচনা আরও তীব্র হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও সংগঠনিক নেতৃত্বের জন্য পরিচিত। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে একাধিকবার নির্বাচিত এ নেতা বর্তমানে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করছেন। দলের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি মহাসচিব হিসেবেও তিনি পরিচিত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তার দীর্ঘ সংগ্রাম, কারাবরণ এবং আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় ভূমিকা তাকে দল ও জোটের ভেতরে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন মির্জা ফখরুল। তিনি ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দেন। ঢাকা কলেজসহ বিভিন্ন সরকারি কলেজে অর্থনীতির শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৯ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আমলে উপ-প্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করেন। ১৯৮২ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তিনি পুনরায় শিক্ষকতায় ফিরে যান এবং ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত ঠাকুরগাঁও সরকারি কলেজে অধ্যাপনা করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন তিনি। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক ও পরে সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে সক্রিয় অংশগ্রহণ তার রাজনৈতিক পরিচিতিকে বিস্তৃত করে। ১৯৮৬ সালে পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে বিএনপিতে যোগ দিয়ে সাংগঠনিকভাবে সক্রিয় হন এবং ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন। একই সময়ে তিনি কৃষকদলের সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন।
১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেন তিনি। ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে নির্বাচিত হয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তিনি মন্ত্রিসভায় ছিলেন।
২০০৯ সালে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালের মার্চে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলওয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করা হয়। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত হন। এরপর থেকে দল পুনর্গঠন, আন্দোলন কর্মসূচি ও নির্বাচন কৌশল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছেন।
২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঠাকুরগাঁও-১ ও বগুড়া-৬ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বগুড়া-৬ আসনে নির্বাচিত হলেও শপথ গ্রহণ না করায় আসনটি পরে শূন্য ঘোষণা করা হয়। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি সংসদে না গিয়ে আন্দোলন কর্মসূচিতে সক্রিয় থাকেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি পদে নিয়োগ পেলে মির্জা ফখরুলের দীর্ঘ প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের জন্য একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসেনি। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
সূত্র: দলীয় কার্যালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র ও নির্বাচন কমিশন সংশ্লিষ্ট তথ্য।
Leave a comment