গত চার বছরে ইউরোপ একাধিক জ্বালানি ধাক্কার মুখে পড়েছে, যার সূচনা হয় ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর। এই যুদ্ধ ইউরোপের জ্বালানি বাজারে তীব্র অস্থিরতা সৃষ্টি করে এবং রাশিয়ার তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমাতে ইউরোপীয় দেশগুলোকে দ্রুত বিকল্প উৎস খুঁজতে বাধ্য করে। এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি, নতুন সরবরাহ উৎস অনুসন্ধান এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর মাধ্যমে একটি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শুরু হলেও বাস্তবতা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো তার মোট জ্বালানি চাহিদার অর্ধেকেরও বেশি আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্যপথে যেকোনো বিঘ্ন বা ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা সরাসরি এর ওপর প্রভাব ফেলছে।
সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত পরিস্থিতি ইউরোপের এই দুর্বলতাকে আবার সামনে নিয়ে এসেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালী কার্যত অচল হয়ে পড়া এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা বিশ্ববাজারে তেল ও গ্যাস সরবরাহে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এর ফলে ইউরোপজুড়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্সের মতো বড় অর্থনীতিগুলো যখন মূল্যস্ফীতি ও শিল্প ব্যয়ের চাপ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল অবস্থানে রয়েছে স্পেন। সাম্প্রতিক তথ্যে দেখা গেছে, স্পেনে প্রতি মেগাওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুতের দাম ছিল মাত্র ১৪ ইউরো, যেখানে একই সময়ে ইতালি, জার্মানি ও ফ্রান্সে সেই দাম ১০০ ইউরোরও বেশি।
বর্তমান সংকটে ইউরোপের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। হরমুজ প্রণালীতে সরবরাহ ব্যাহত হওয়া এবং ইরানকে কেন্দ্র করে যুদ্ধ পরিস্থিতি জ্বালানির দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, যা সরাসরি শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলছে।
এই প্রেক্ষাপটে স্পেনের স্থিতিশীলতার পেছনে রয়েছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। প্রথমত, দেশটির জ্বালানি কাঠামো ইউরোপের মূলধারার দেশগুলোর তুলনায় ভিন্ন। গত এক দশকে স্পেন নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে, বিশেষ করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে। বর্তমানে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে, ফলে আন্তর্জাতিক গ্যাসের দামের ঊর্ধ্বগতি সরাসরি বিদ্যুতের দামে প্রতিফলিত হয় না।
দ্বিতীয়ত, ইউরোপের বিদ্যুৎ বাজারে ব্যবহৃত মার্জিনাল প্রাইসিং পদ্ধতি এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই ব্যবস্থায় বিদ্যুতের দাম নির্ধারিত হয় সবচেয়ে বেশি খরচে উৎপাদিত বিদ্যুতের ভিত্তিতে, যা সাধারণত গ্যাস থেকে আসে। ফলে গ্যাসের দাম বাড়লেই বিদ্যুতের দাম বেড়ে যায়। তবে স্পেনে গ্যাসনির্ভর উৎপাদনের অংশ কম হওয়ায় এই প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকে, যেখানে জার্মানি বা ইতালিতে এর প্রভাব সরাসরি ভোক্তাদের ওপর পড়ে।
তৃতীয়ত, স্পেন নবায়নযোগ্য জ্বালানির পাশাপাশি পারমাণবিক বিদ্যুৎ ব্যবস্থাকে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ব্যবহার করছে। সৌর ও বায়ু শক্তির ওঠানামা সামাল দিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎ একটি স্থিতিশীল বেসলোড সরবরাহ নিশ্চিত করে, যা বাজারে দামের অস্থিরতা কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
চতুর্থত, ভৌগলিক ও অবকাঠামোগত দিক থেকেও স্পেন আলাদা অবস্থানে রয়েছে। দেশটি ইউরোপের কেন্দ্রীয় গ্যাস পাইপলাইন নেটওয়ার্কের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কম সংযুক্ত, ফলে ইউরোপের মূল গ্যাসবাজারের অস্থিরতা সরাসরি সেখানে কম প্রভাব ফেলে। একই সঙ্গে স্পেনের রয়েছে ইউরোপের অন্যতম বৃহৎ এলএনজি টার্মিনাল নেটওয়ার্ক, যা বিভিন্ন উৎস থেকে গ্যাস আমদানির সুযোগ তৈরি করে এবং সরবরাহ বৈচিত্র্য নিশ্চিত করে।
তবে এই ইতিবাচক চিত্রের মধ্যেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার প্রভাব স্পেনের অর্থনীতিতেও পড়ছে এবং সরকার ইতোমধ্যে ভোক্তাদের সহায়তায় বড় অঙ্কের প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। দেশটির প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ ব্রাসেলসে এক বক্তব্যে বলেন, নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগই স্পেনকে বর্তমান সংকটে তুলনামূলক নিরাপদ অবস্থানে রেখেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্পেনের এই অবস্থান আকস্মিক নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিনিয়োগ এবং কাঠামোগত পরিবর্তনের ফল। নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং জ্বালানি ব্যবস্থার ভারসাম্যপূর্ণ উন্নয়নের মাধ্যমে দেশটি একটি শক্তিশালী সুরক্ষা বলয় তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, ইউরোপের বর্তমান জ্বালানি সংকট একটি বিষয় স্পষ্ট করেছে—শুধু সরবরাহ উৎস পরিবর্তন নয়, বরং পুরো জ্বালানি কাঠামোর পুনর্গঠনই ভবিষ্যতের জন্য টেকসই সমাধান হতে পারে।
Leave a comment