বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় সম্প্রতি এক বক্তব্যে জুলাই আন্দোলনে প্রাণহানির প্রসঙ্গে মন্তব্য করে নতুন রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছেন। ভারতের কলকাতায় আয়োজিত এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রায় আধা ঘণ্টার বক্তৃতা দেন, যেখানে তিনি আন্দোলন, সহিংসতা এবং আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন বক্তব্য তুলে ধরেন।
অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে জয় দাবি করেন, কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় বহু ছাত্র ও সাধারণ মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং এই ঘটনাকে তিনি সরকারের একটি ব্যর্থতা হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্যমতে, আন্দোলনকারীদের দাবির যৌক্তিকতা ছিল এবং সরকার কোটা ব্যবস্থা বাতিল করলেও পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়ায় বিষয়টি পুনরায় জটিল হয়ে ওঠে। তিনি বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা থেকেই অস্থিতিশীলতা বাড়ে।
তবে সহিংসতার উৎস নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন জয়। তার দাবি, কিছু উগ্রপন্থি গোষ্ঠী থানায় হামলা চালানোর মাধ্যমে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটায়। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আগে থেকে সহিংসতা শুরু করেনি; বরং উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড থেকেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়।
বক্তৃতায় জয় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে নির্বাচন আয়োজন করা হচ্ছে, যা প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশকে সীমিত করছে। তিনি বলেন, এতে নির্বাচনী লড়াই কার্যত কয়েকটি দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে এবং অন্য দলগুলো প্রচারের সুযোগ পাচ্ছে না। তার ভাষায়, অংশগ্রহণমূলক কাঠামো ছাড়া নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারাতে পারে।
জয় আরও বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়, তবে তা দেশের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজরদারি ও কূটনৈতিক উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করেন, যাতে একটি “সুষম ও বিশ্বাসযোগ্য” পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
ভারতের পূর্ব সীমান্ত নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক ভূরাজনীতি নিয়েও বক্তব্য দেন তিনি। তার দাবি অনুযায়ী, বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন প্রতিবেশী অঞ্চলেও প্রভাব ফেলতে পারে। তিনি বিশেষভাবে সতর্ক করেন যে, উগ্র মতাদর্শভিত্তিক রাজনীতি শক্তিশালী হলে তা নিরাপত্তা ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে। যদিও এসব মন্তব্য তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলন, তবুও বিষয়টি নিয়ে সরকারি বা সংশ্লিষ্ট দলগুলোর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
জয় ৫ থেকে ১৫ আগস্টের সময়কার সহিংসতার প্রসঙ্গও টানেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, ওই সময়কালে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও পুলিশ সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনাও তদন্তের আওতায় আনা উচিত। তিনি বলেন, যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের সময় সংঘটিত সহিংসতা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, জয়ের বক্তব্য বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় গুরুত্বপূর্ণ হলেও, তার উপস্থাপিত তথ্য ও দাবির নিরপেক্ষ যাচাই প্রয়োজন। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ছাত্র আন্দোলন, এবং নির্বাচন ইস্যু ইতোমধ্যেই আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
সার্বিকভাবে, তার এই বক্তব্য নতুন করে জুলাই আন্দোলনের সহিংসতা, রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। পরিস্থিতির নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং সব পক্ষের অংশগ্রহণ ছাড়া রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা অর্জন কঠিন হতে পারে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।
Leave a comment