ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রাথমিকভাবে মেয়র প্রার্থী নির্ধারণ করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলীয় একাধিক সূত্র জানিয়েছে, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ—উভয় সিটিতেই তরুণ ও আন্দোলন-পরিচিত মুখকে সামনে আনার কৌশল নিয়েছে দলটি।
দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) নির্বাচনে মেয়র পদে প্রাথমিকভাবে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব। অন্যদিকে, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি) নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে বাছাই করা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির নেতা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আরিফুল ইসলাম আদীব সদ্য সমাপ্ত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-১৮ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। বিএনপির প্রার্থীর কাছে পরাজিত হলেও তিনি ১ লাখ ১১ হাজার ২৯৭ ভোট অর্জন করেন, যা দলটির কাছে তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
নগর ও পরিবেশবিষয়ক বিভিন্ন সভা-সেমিনারে দলীয় প্রতিনিধিত্বের পাশাপাশি জুলাই গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় সংগঠক হিসেবেও পরিচিত তিনি। দলের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় তাকে ‘সংগঠক-নির্ভর প্রার্থী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
ঢাকা দক্ষিণে প্রস্তাবিত প্রার্থী আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম মুখ হিসেবে পরিচিত। অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও সংসদ নির্বাচনের আগে তিনি সেই পদ থেকে সরে দাঁড়ান। বর্তমানে এনসিপির মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সংসদ নির্বাচনের পর তিনি জোটসঙ্গী বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশ-এর আমির মাওলানা মামুনুল হক এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর আমির মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বৈঠকগুলো আসন্ন সিটি নির্বাচনে জোটগত সমঝোতার ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
দলীয় আলোচনায় ঢাকা-৮ আসনের পরাজিত প্রার্থী নাসির উদ্দিন পাটওয়ারীর নামও ঘুরেফিরে আসছে বলে জানা গেছে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়নি।
এনসিপির এক কেন্দ্রীয় নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, রমজানের পর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে—এমন সম্ভাবনা ধরে দলটি প্রস্তুতি নিচ্ছে। কাউন্সিলর প্রার্থীদের তালিকাও প্রাথমিকভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনার পর সমন্বিত তালিকা চূড়ান্ত করা হবে।
এবারের সিটি নির্বাচনেও জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোটের সঙ্গে সমঝোতার ভিত্তিতে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে এনসিপির। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা মহানগরীর তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে একটি আসনে জয় পাওয়ার পাশাপাশি অন্যান্য আসনেও উল্লেখযোগ্য ভোট অর্জন করেছে বলে দাবি দলটির নেতাদের।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল ও ভোটের হার বিশ্লেষণ করে এনসিপি নগর রাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে চাইছে। বিশেষ করে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা ধরে রাখতে তরুণ নেতৃত্বকে সামনে আনার কৌশলকে তারা গুরুত্ব দিচ্ছে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জোট একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে সরকার গঠন করে। এনসিপি ছয়জন সংসদ সদস্য নিয়ে জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোটে অবস্থান করছে।
দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনেই স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ঘোষণা দেন। এদিকে নির্বাচন কমিশন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের প্রস্তুতি শুরু করেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সব মিলিয়ে, জাতীয় নির্বাচনের রেশ কাটতে না কাটতেই ঢাকার নগর রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। তরুণ নেতৃত্ব ও জোটভিত্তিক কৌশল—এই দুইকে সামনে রেখে এনসিপি এবার সিটি নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলতে পারে, সেটিই এখন রাজনৈতিক অঙ্গনের আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
Leave a comment