আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্র পরিচালনার পরিকল্পনা এবং ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত কথা বলেছেন। মঙ্গলবার (৯ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নির্বাচনে জয়ী হলে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গণতন্ত্রের স্বার্থে শক্তিশালী সরকার ও কার্যকর বিরোধী দল—উভয়ই প্রয়োজন। “সবাই মিলে সরকার গঠনের চেয়ে এককভাবে সরকার গঠন এবং শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা গণতন্ত্রের জন্য জরুরি।
দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে দেশে ফেরা এবং নির্বাচনী উত্তেজনার মাঝেই মাতৃবিয়োগের শোক—এই দুই বাস্তবতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা তার জীবনের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বলে উল্লেখ করেন তারেক রহমান। তিনি বলেন, ব্যক্তিগত শোক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব একই সঙ্গে সামাল দিতে হয়েছে তাকে।
তিনি আরও বলেন, বিএনপি আশা করছে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে এবং ভোটাররা তাদের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি মন্তব্য করেন, জনগণ যাকে গ্রহণ করবে না, তাকে শক্তি প্রয়োগ করে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। তার মতে, রাজনীতিতে জনসমর্থনই চূড়ান্ত নির্ধারক শক্তি।
দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী—এই বাস্তবতা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে নারীশিক্ষা ও নারীর ক্ষমতায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, বেগম খালেদা জিয়ার আমলে মেয়েদের দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা হয়েছিল। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই সুবিধা আরও উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
এছাড়া প্রান্তিক গৃহিণীদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন বিএনপি চেয়ারম্যান। তার মতে, এ উদ্যোগের মাধ্যমে নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে আর্থিকভাবে সহায়তা ও স্বাবলম্বী করার সুযোগ তৈরি হবে।
প্রতিবন্ধী, তরুণ ও প্রবীণ নাগরিকদের জন্যও ইশতেহারে আলাদা কর্মসূচি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়ে তারেক রহমান বলেন, তার অগ্রাধিকার হবে বাংলাদেশের জনগণের স্বার্থ। “আমি প্রতিনিধিত্ব করি আমার দেশের মানুষের। কোনো চুক্তি যদি দেশের স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তবে সেই দেশের সঙ্গে স্বাভাবিকভাবেই দূরত্ব তৈরি হবে,”—মন্তব্য করেন তিনি।
তার মতে, পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখা হবে।
গত দেড় দশকে সংঘটিত গুম ও খুনের অভিযোগের প্রসঙ্গে বিএনপি চেয়ারম্যান কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, একটি সভ্য রাষ্ট্রে মানুষ গুম হয়ে যাবে আর বিচার হবে না—এটি গ্রহণযোগ্য নয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচারের অধিকার রাখে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আশ্বস্ত করেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বিচার নিশ্চিত করতে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দলের কিছু প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণখেলাপির অভিযোগ প্রসঙ্গে তারেক রহমান বলেন, ব্যবসায়িক কারণে ডিফল্ট হওয়া এবং দুর্নীতি এক নয়। তার দাবি, বিগত সরকারের সময়ে বিএনপির ব্যবসায়ী নেতাকর্মীরা প্রশাসনিক ও আর্থিক চাপের মুখে পড়েছিলেন, যার ফলে অনেকেই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঋণখেলাপি হয়েছেন।
তবে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিএনপি ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করবে বলে তিনি জানান। ইশতেহারে দুর্নীতি দমনকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
ডয়চে ভেলেকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক রহমান একক সরকার গঠনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করার পাশাপাশি গণতন্ত্র, নারীশিক্ষা, ন্যায়বিচার ও বৈদেশিক সম্পর্ক নিয়ে দলের অগ্রাধিকার তুলে ধরেছেন। এখন নজর আসন্ন নির্বাচনের দিকে—ভোটারদের রায়ই নির্ধারণ করবে দেশের পরবর্তী রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা।
Leave a comment