Home জাতীয় জাসদ থেকে জামায়াতের শীর্ষে: গোপনেই ‘ইসলামপন্থি’ সংগঠনের দেখা পেয়েছিলেন শফিকুর রহমান
জাতীয়রাজনীতি

জাসদ থেকে জামায়াতের শীর্ষে: গোপনেই ‘ইসলামপন্থি’ সংগঠনের দেখা পেয়েছিলেন শফিকুর রহমান

Share
Share

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আদর্শগত পরিবর্তন, সাংগঠনিক পুনর্গঠন এবং নেতৃত্বের রূপান্তর—এই তিনটি বিষয় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। ছাত্রজীবনে জাসদ ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, পরবর্তীতে ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগদান এবং শেষ পর্যন্ত জামায়াতের শীর্ষ নেতৃত্বে আরোহন—তার রাজনৈতিক জীবন একদিকে যেমন বিতর্কিত, অন্যদিকে তেমনি বিশ্লেষকদের কাছে তা একটি তাৎপর্যপূর্ণ রূপান্তরের উদাহরণ।

ছাত্ররাজনীতির শুরু: জাসদ ছাত্রলীগ প্রসঙ্গ
জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত জীবনী অনুযায়ী, শফিকুর রহমান ১৯৭৩ সালে জাসদ ছাত্রলীগের মাধ্যমে ছাত্ররাজনীতিতে যুক্ত হন। তখন দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ছিল উত্তাল। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে তরুণদের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা ছিল প্রবল, এবং জাসদ ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের মতো সংগঠনগুলো ব্যাপক সমর্থন পেত।

তবে সমসাময়িক কয়েকজন জাসদ নেতার দাবি, শফিকুর রহমানের সক্রিয় সম্পৃক্ততার বিষয়ে তাদের কাছে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। সাবেক ডাকসু জিএস ডা. মুশতাক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, সিলেট অঞ্চলের তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের নেতাদের কাছ থেকে তিনি শফিকুর রহমানের সক্রিয় ভূমিকার প্রমাণ পাননি। যদিও তিনি স্বীকার করেন, সে সময় অনেক শিক্ষার্থীই জাসদের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিলেন।
রাজনৈতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা রয়েছে যে, স্বাধীনতার পর জামায়াতে ইসলামী নিষিদ্ধ থাকাকালে কিছু ভবিষ্যৎ জামায়াত নেতা বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব বিষয়ে স্পষ্ট প্রমাণ ও দলিলভিত্তিক তথ্য সীমিত।

হতাশা, দূরত্ব ও ‘গোপন সংগঠনের’ সন্ধান-
শফিকুর রহমান নিজেই এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছেন, এমসি কলেজে পড়াকালে তিনি জাসদ ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডে হতাশ হন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, সংগঠনের কিছু কার্যক্রম—যেমন ব্যাংক ও অস্ত্র লুট—তাকে বিচলিত করেছিল। একপর্যায়ে তিনি রাজনীতি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন।

পরবর্তীতে কলেজ হোস্টেলে সহপাঠীদের মাধ্যমে একটি ‘গোপন ইসলামি ছাত্র সংগঠনের’ সঙ্গে পরিচিত হন। তিনি বলেন, সংগঠনটি অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনা করত এবং তাদের কাছ থেকেই তিনি ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাজনীতির দাওয়াত গ্রহণ করেন।
এই অভিজ্ঞতার পর ১৯৭৭ সালে তিনি ইসলামী ছাত্রশিবিরে যোগ দেন এবং সিলেট মেডিকেল কলেজ শাখা ও সিলেট শহর শাখার সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।

আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে যোগদান
১৯৮৩ সালে এমবিবিএস সম্পন্ন করার পর শফিকুর রহমান পূর্ণকালীনভাবে রাজনীতিতে মনোনিবেশ করেন। ১৯৮৪ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। এরপর ধাপে ধাপে তিনি সিলেট জেলা ও মহানগরের সেক্রেটারি, নায়েবে আমির ও আমির হিসেবে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৯৮ সালে তিনি জামায়াতের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য হন। ২০১০ সালে সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল পদে উন্নীত হন। দলটির তৎকালীন শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তার ও দণ্ড কার্যকরের সময় দলীয় নেতৃত্বে যে শূন্যতা তৈরি হয়, সেই প্রেক্ষাপটে তার উত্থান ত্বরান্বিত হয়।

নেতৃত্বের শূন্যতা ও উত্থান
২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতের কয়েকজন শীর্ষ নেতার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। এতে দলটি সাংগঠনিক ও কৌশলগত সংকটে পড়ে। বিশ্লেষকদের মতে, এই সময়ই দলটির ভেতরে নতুন, তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে আনার আলোচনা জোরদার হয়।
২০১১ সালে তিনি ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেলের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালে পূর্ণাঙ্গ সেক্রেটারি জেনারেল এবং ২০১৯ সালের নভেম্বরে রুকনদের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রথমবারের মতো আমির নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে ২০২৩ ও ২০২৫ সালেও তিনি পুনর্নির্বাচিত হন।

নেতৃত্বের নতুন ‘ডাইমেনশন’?
দৈনিক নয়াদিগন্তের সম্পাদক সালাহউদ্দিন মুহাম্মদ বাবরের ভাষ্য অনুযায়ী, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত নিজস্ব সাংগঠনিক খোলস ভেঙে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছে। সংখ্যালঘু ও মুক্তিযোদ্ধাদের মনোনয়ন দেওয়া—এ ধরনের পদক্ষেপকে তিনি দলটির ইতিহাসে একটি ভিন্ন মাত্রা হিসেবে দেখেন।
তবে সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ দলটির ভাবমূর্তি পুনর্গঠনের কৌশল হতে পারে। তাদের যুক্তি, অতীতের রাজনৈতিক অবস্থান ও ভূমিকা থেকে বেরিয়ে এসে মূলধারায় গ্রহণযোগ্যতা অর্জনই এখন জামায়াতের প্রধান লক্ষ্য।

বিতর্ক ও ব্যাখ্যা
শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের শুরু নিয়ে বিতর্ক এখনো রয়েছে। জাসদ ছাত্রলীগে তার সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও তিনি নিজে স্বীকার করেছেন যে, স্বাধীনতা-পরবর্তী প্রতিবাদী তরুণদের স্রোতে তিনি যুক্ত হয়েছিলেন। পরবর্তীতে আদর্শগত কারণে সরে এসে ইসলামী ধারার রাজনীতিতে সম্পৃক্ত হন।
কিছু রাজনৈতিক বিশ্লেষক মনে করেন, সে সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা অনেকের ক্ষেত্রেই ছিল কৌশলগত। আবার অন্যদের মতে, এটি ছিল ব্যক্তিগত আদর্শগত বিবর্তনের ফল।

আদর্শগত বিবর্তন না কৌশলগত অবস্থান?
প্রশ্ন উঠেছে—শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক পরিবর্তন কি আদর্শগত বিবর্তন, নাকি সময়োপযোগী কৌশল? তার সমর্থকরা বলছেন, এটি ছিল ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্ত। সমালোচকরা মনে করেন, স্বাধীনতার পরবর্তী নিষেধাজ্ঞার সময় ইসলামী রাজনীতির সঙ্গে প্রকাশ্যে যুক্ত হওয়া কঠিন ছিল, তাই ভিন্ন প্ল্যাটফর্মে অবস্থান ছিল নিরাপদ কৌশল।
এই দ্বৈত ব্যাখ্যার মাঝেই দাঁড়িয়ে রয়েছে তার দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, যা বাংলাদেশে আদর্শভিত্তিক রাজনীতির জটিলতাকেই প্রতিফলিত করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপট
বর্তমানে জামায়াতে ইসলামী নিজেদের সাংগঠনিক পুনর্গঠন ও রাজনৈতিক পুনঃঅবস্থান নির্ধারণে ব্যস্ত। বিশ্লেষকদের মতে, শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে দলটি একটি নতুন রাজনৈতিক ভাষা ও কৌশল গ্রহণের চেষ্টা করছে—যেখানে সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও নির্বাচনী অংশগ্রহণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তবে বাংলাদেশের রাজনীতির বহুমাত্রিক বাস্তবতায় দলটির সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। অতীতের ভূমিকা, বিচারিক রায় এবং জনমতের প্রশ্ন—সবকিছুর মধ্যেই তাকে এগিয়ে নিতে হচ্ছে দলকে।

ডা. শফিকুর রহমানের রাজনৈতিক জীবন বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতি ও মূলধারার রাজনীতির পরিবর্তনশীল ইতিহাসের একটি প্রতিচ্ছবি। জাসদ ছাত্রলীগ থেকে ইসলামী ছাত্রশিবির, সেখান থেকে জামায়াতের আমির—এই যাত্রা যেমন ব্যক্তিগত আদর্শগত রূপান্তরের গল্প, তেমনি তা দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতারও প্রতিফলন।
তার নেতৃত্বে জামায়াতে ইসলামী কতটা দীর্ঘমেয়াদে নিজেদের পুনর্গঠন ও গ্রহণযোগ্যতা অর্জনে সফল হবে, সেটিই এখন দেখার বিষয়। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, শফিকুর রহমানের উত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।

Share

Leave a comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Don't Miss

কারাগারে রাজপাল যাদব

বলিউডের পর্দায় যার উপস্থিতি মানেই হাসির রোল, সেই জনপ্রিয় অভিনেতা রাজপাল যাদব এখন কারাগারে। ৯ কোটি রুপির ঋণের দায়ে শেষ পর্যন্ত এই কমেডিয়ানকে...

সরাইলে ৫ হাজার ইয়াবাসহ মাদক কারবারি গ্রেপ্তার

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলায় মাদকবিরোধী অভিযানে ৫ হাজার পিস ইয়াবাসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) রাত ৯টার দিকে...

Related Articles

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন: এনসিপি নেতাদের ভোটকেন্দ্র ও সময়সূচি ঘোষণা

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ১১ দলীয় ঐক্য মনোনীত জাতীয় নাগরিক...

গণভোটে ‘না’ ভোট দেবেন আসিফ মাহতাব

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় গণভোটে জুলাই সনদের বিপক্ষে ‘না’ ভোট দেওয়ার ঘোষণা...

‘জিতলে বিএনপি এককভাবে সরকার গঠন করবে’

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক...

ইতিহাসের এই দিনে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য ঘটনা

আজ বুধবার ১১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ইংরেজি। ২৮ মাঘ, ১৪৩২ বাংলা। ২৩ শাবান,...