বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম কলঙ্কিত অধ্যায় দাসপ্রথাকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ হিসেবে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদান এবং এর জন্য ক্ষতিপূরণ দাবির একটি প্রস্তাব জাতিসংঘে গৃহীত হয়েছে। আফ্রিকার দেশগুলোর পক্ষে ঘানার উত্থাপিত এই ঐতিহাসিক প্রস্তাবটি বুধবার সাধারণ পরিষদে পাস হয়। তবে বিশ্বমঞ্চে এই প্রস্তাবের বিপক্ষে সরাসরি অবস্থান নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও আর্জেন্টিনা।
জাতিসংঘে অনুষ্ঠিত ভোটাভুটিতে প্রস্তাবটির পক্ষে ১২৩টি দেশ ভোট দেয়। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলসহ তিনটি দেশ বিপক্ষে ভোট দেয় এবং যুক্তরাজ্য, জাপান ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্য রাষ্ট্রসহ মোট ৫২টি দেশ ভোটদান থেকে বিরত ছিল।
গৃহীত এই প্রস্তাবে আফ্রিকা থেকে আটলান্টিক পাড়ি দেওয়া দাস ব্যবসা এবং বর্ণবাদী দাসত্বকে ‘মানবতাবিরোধী জঘন্যতম অপরাধ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, আফ্রিকান এবং আফ্রিকান বংশোদ্ভূতদের বিরুদ্ধে ঘটে যাওয়া কয়েক শতাব্দীর অন্যায়ের প্রতিকার হিসেবে অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষতিপূরণ দাবি করা একটি বাস্তবসম্মত ও ন্যায়সংগত পদক্ষেপ।
ভোটের আগে মার্কিন উপ-রাষ্ট্রদূত ড্যান নেগ্রিয়া যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিষ্কার করে বলেন, ওয়াশিংটন দাসপ্রথার অন্যায়কে স্বীকার করলেও এই ঐতিহাসিক ভুলের জন্য কোনো ধরনের ‘আইনি ক্ষতিপূরণ’ দিতে বাধ্য নয়। তিনি যুক্তি দেখান যে, যখন দাসপ্রথা প্রচলিত ছিল, তখন তৎকালীন আন্তর্জাতিক আইনে তা অবৈধ ছিল না। এছাড়া তিনি অভিযোগ করেন, এই প্রস্তাবের মাধ্যমে অপরাধের শ্রেণিবিন্যাস করে অন্যান্য ঐতিহাসিক নৃশংসতাকে খাটো করে দেখা হয়েছে।
ইতিহাসের তথ্যানুযায়ী, প্রায় ৪০০ বছর ধরে আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ১২ কোটিরও বেশি মানুষকে আফ্রিকা থেকে দাস হিসেবে পাচার করা হয়েছিল। এই দীর্ঘ ও অমানবিক যাত্রাপথে অন্তত ২৪ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং গন্তব্যে পৌঁছানোর পর আরও লাখ লাখ মানুষ অবর্ণনীয় নির্যাতন ও শোষণের শিকার হন। ১৯৮১ সালে মৌরিতানিয়া সর্বশেষ দেশ হিসেবে দাসপ্রথা বিলুপ্ত করলেও এর অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষত আজও আফ্রিকা মহাদেশকে বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।
ভোট পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় ঘানার পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্যামুয়েল ওকুদজেতো অ্যাবলাকুয়া একে একটি ‘ঐতিহাসিক পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করে বলেন, “আমরা আজ কেবল একটি পাঠ্য পাস করিনি, বরং একটি ধ্রুব সত্যকে নিশ্চিত করেছি। আমরা নীরবতার বদলে স্মৃতিকে এবং বিভাজনের বদলে অভিন্ন মানবতাকে বেছে নিয়েছি।”
অন্যদিকে, বর্ণবাদবিরোধী কর্মীরা মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর সমালোচনা করেছেন। সম্প্রতি ট্রাম্পের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ তিনি দাসপ্রথার নেতিবাচক দিক নিয়ে প্রচারণার সমালোচনা করেছিলেন। ট্রাম্পের নির্দেশে হোয়াইট হাউস থেকে মিউজিয়ামগুলোর প্রদর্শনীর ভাষা পরিবর্তনের যে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা ইতিহাসকে আড়াল করার প্রচেষ্টা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
Leave a comment