ব্রিটিশ রাজপরিবারের সদস্য প্রিন্স অ্যান্ড্রুর বিরুদ্ধে চীনের কথিত এক গুপ্তচরের সঙ্গে গভীর সম্পর্ক থাকার নতুন তথ্য ফাঁস হয়েছে। গোপন রাখা নথিপত্রে প্রকাশ পেয়েছে, বিতর্কিত সেই সাক্ষাৎকারের (২০১৯ সালের নিউজনাইট সাক্ষাৎকার) পর যখন অ্যান্ড্রুর ভাবমূর্তি একেবারেই ভেঙে পড়ে, তখন তার প্রধান উপদেষ্টা ডমিনিক হ্যাম্পশায়ার ওই চীনা ব্যক্তিকে “টানেলের শেষ প্রান্তের একমাত্র আলো” হিসেবে দেখতেন।
চীনা নাগরিক ইয়াং তেংবো—যাকে ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থা এমআই৫ সন্দেহভাজন গুপ্তচর হিসেবে চিহ্নিত করেছে—তার সঙ্গে অ্যান্ড্রুর সম্পর্ক নিয়ে আদালতে গোপন থাকা এই নথিগুলো প্রকাশিত হয়, বিবিসিসহ বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের আইনি চাপের পর। ইয়াং অবশ্য সব ধরনের ভুলকর্মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
নথিগুলোতে জানা যায়, ইয়াং তেংবোর মাধ্যমে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রিন্স অ্যান্ড্রুর একটি “যোগাযোগ চ্যানেল” তৈরি হয়েছিল। এই যোগাযোগের অংশ হিসেবে প্রতিবছর শি-কে জন্মদিনের শুভেচ্ছাপত্র পাঠানো হতো। অ্যান্ড্রু বিশ্বাস করতেন, ইয়াংয়ের সহায়তায় তিনি চীনে ব্যবসায়িক সুযোগের মাধ্যমে নিজের জনসম্মুখে অবস্থান পুনরুদ্ধার করতে পারবেন।
এমনকি “ইউরেশিয়া ফান্ড” নামে একটি বিনিয়োগ প্রকল্পের বিষয়ে শি-কে সরাসরি জানানোও হয়েছিল, যেটি অ্যান্ড্রু পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন। ইয়াং নিজেই এই প্রকল্পটি চীন সরকারের কাছে তুলে ধরেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
নথিতে উঠে এসেছে রাজপরিবারের অভ্যন্তরে অ্যান্ড্রুকে ঘিরে নানা বিভ্রান্তি ও আস্থা সংকটের চিত্র। উইন্ডসর প্রাসাদে গোপন বৈঠকে অংশ নিতে সাংবাদিকদের চোখ এড়িয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করেছিলেন অ্যান্ড্রু। এসব বৈঠকে রাজা চার্লস, ডিউক অ্যান্ড্রু এবং উপদেষ্টা হ্যাম্পশায়ার উপস্থিত ছিলেন।
ডমিনিক হ্যাম্পশায়ার স্বীকার করেছেন, রাজপরিবারের বিভিন্ন স্তরে “সব জায়গায় ফাঁস হওয়া তথ্য” ছড়িয়ে ছিল, যার কারণে অ্যান্ড্রুর পরিকল্পনা গোপন রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। এসব কারণে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে অ্যান্ড্রুর ব্যক্তিগত সচিবকে পর্যন্ত বাদ দেওয়া হয়।
২০১৯ সালের বিতর্কিত সাক্ষাৎকারের পর থেকেই রাজপরিবারে একঘরে হয়ে পড়েন অ্যান্ড্রু। সেই সময় ইয়াং তেংবো ছিলেন তার কাছের ও বিশ্বাসযোগ্য একজন ব্যক্তি। রাজপ্রাসাদের অভ্যন্তরীণ মনোভাব বর্ণনা করতে গিয়ে হ্যাম্পশায়ার বলেন, “ডিউকের ভাবমূর্তি তখন একেবারেই পুনরুদ্ধারযোগ্য ছিল না।”
নথিপত্রে আরও উঠে এসেছে, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির একটি গোপন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী শাখার সঙ্গে ইয়াংয়ের যোগাযোগ ছিল, যেটি ব্রিটেনে রাজনীতিবিদ, একাডেমিক এবং ব্যবসায়ীদের প্রভাবিত করতে গোপনে কাজ করে থাকে।
এ ধরনের ধীর ও কৌশলী প্রভাব বিস্তার প্রক্রিয়াকে “এলিট ক্যাপচার” বলা হয়ে থাকে। বিশেষ অভিবাসন আপিল কমিশন (Siac) জানিয়েছে, অ্যান্ড্রুর সঙ্গে ইয়াংয়ের সম্পর্ক “অস্বাভাবিক মাত্রার আস্থার” পরিচায়ক।
নথিপত্র প্রকাশের পর বাকিংহাম প্যালেস সাফ জানিয়ে দিয়েছে, রাজা চার্লসের সঙ্গে ইয়াং তেংবোর কোনো ধরনের যোগাযোগ ছিল না। তারা জানায়, ওই সন্দেহভাজন গুপ্তচরের নাম কখনো কোনো বৈঠকে উচ্চারিত হয়নি এবং তার সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্কের অনুমোদনও দেওয়া হয়নি।
এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁসের মাধ্যমে আবারও প্রশ্ন উঠেছে রাজপরিবারের সদস্যদের কূটনৈতিক ও ব্যবসায়িক ভূমিকা, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কে—বিশেষত যখন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের বিষয়গুলো এত সংবেদনশীল পর্যায়ে পৌঁছে গেছে।
Leave a comment