আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। তাঁর মতে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে দেশে আর কখনো অপশাসনের ফিরে আসার সুযোগ থাকবে না এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় একটি নতুন, জবাবদিহিমূলক অধ্যায় সূচিত হবে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) সচিবদের সঙ্গে আয়োজিত এক গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা এসব কথা বলেন। পরে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক ব্রিফিংয়ে তাঁর বক্তব্যের বিস্তারিত তুলে ধরেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম।
প্রেস সচিব জানান, অনুষ্ঠানে সিনিয়র সচিব ও সচিবসহ প্রায় ৭০ জন উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে প্রধান উপদেষ্টা সীমিত পরিসরে বক্তব্য দেন এবং পরে উপস্থিত কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ছবি তোলেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, অতীতে দেশে যে নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠিত হয়েছে, সেগুলো প্রকৃত অর্থে গণতান্ত্রিক নির্বাচন ছিল না; বরং সেগুলো ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও বিশ্বাসযোগ্যতাহীন। তবে আসন্ন নির্বাচন হবে সম্পূর্ণ ভিন্ন—সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ এবং জনগণের প্রকৃত মতামত প্রতিফলনকারী।
প্রধান উপদেষ্টা জোর দিয়ে বলেন, এই নির্বাচন ও গণভোট দেশের রাজনৈতিক কাঠামোয় মৌলিক পরিবর্তন আনবে। বিশেষ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের সরাসরি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত হওয়াকে তিনি একটি ঐতিহাসিক অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন। অতীতে বিভিন্ন গণ-অভ্যুত্থান ও রাজনৈতিক আন্দোলনে প্রবাসীদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এবার সেই ভূমিকা প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও কাঠামোগত শক্তি পাচ্ছে। এর ফলে ভবিষ্যতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে প্রবাসীরা আরও কার্যকর ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারবেন।
ভোট প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তির ব্যবহার প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এবারের নির্বাচনে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক প্রয়োগ করা হচ্ছে, যাতে ভোটদান আরও সহজ, স্বচ্ছ ও নিরাপদ হয়। ভোটারদের জন্য একটি বিশেষ অ্যাপ চালু করা হয়েছে, যেখানে ভোটদানের পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট নির্দেশনা পাওয়া যাবে। পাশাপাশি প্রায় ৪৩ হাজার ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তা ও পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য পৃথক নির্বাচনভিত্তিক মনিটরিং অ্যাপ ব্যবহৃত হচ্ছে।
তিনি জানান, ‘নির্বাচন বন্ধু হটলাইন–৩৩৩’ চালু করা হয়েছে, যাতে যেকোনো অনিয়ম বা সমস্যা দ্রুত জানানো যায়। এছাড়া প্রায় ২৫ হাজার ৭০০টি বডি ওর্ন ক্যামেরা ব্যবহারের পাশাপাশি সব ভোটকেন্দ্রে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। এসব ব্যবস্থার মাধ্যমে এবারের নির্বাচন আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অধিক গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের উপস্থিতি নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক নির্বাচন পর্যবেক্ষক বাংলাদেশে আসছেন, যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার স্পষ্ট ইঙ্গিত। তাঁর ভাষায়, এটি প্রমাণ করে যে, বিশ্ব বাংলাদেশে অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনার শাসনামলে অনুষ্ঠিত আগের তিনটি নির্বাচনের আন্তর্জাতিক বৈধতা ছিল না এবং সে সময় উল্লেখযোগ্য কোনো পর্যবেক্ষকও উপস্থিত ছিলেন না।
নির্বাচনী পরিবেশ সম্পর্কে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, এখন পর্যন্ত নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বড় ধরনের কোনো উত্তেজনা বা সহিংসতার লক্ষণ দেখা যায়নি। প্রচারণা শান্তিপূর্ণভাবে চলছে এবং রাজনৈতিক দলগুলো দায়িত্বশীল আচরণ করছে। জনসমাগম বেশি হলেও সার্বিকভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত ও স্থিতিশীল রয়েছে।
গেট টুগেদার অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা গত ১৮ মাসে প্রশাসনের ভূমিকার জন্য সচিবদের ধন্যবাদ জানান। তিনি বলেন, এ সময়ে প্রায় ১৩০টি অধ্যাদেশ জারি ও বাস্তবায়নে সচিবরা যে দক্ষতা ও সহযোগিতা দেখিয়েছেন, তা অত্যন্ত প্রশংসনীয় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় গতি এনেছে।
ভবিষ্যৎ অর্থনীতি প্রসঙ্গে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, বাংলাদেশ উন্নয়নের পথে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যাবে। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী একটি বড় সম্পদ, যা ভবিষ্যতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশে এসে নতুন কারখানা স্থাপন করবেন।
জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করলে আন্তর্জাতিক বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পাওয়া সম্ভব হবে। এ বাস্তবতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য বাংলাদেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলবে।
শেষে প্রধান উপদেষ্টা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ একটি শক্তিশালী, গণতান্ত্রিক ও ন্যায্য রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে উঠবে—যেখানে অপশাসনের আর কোনো স্থান থাকবে না।
Leave a comment