বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম ট্রাওরে বলেছেন, জনগণকে গণতন্ত্রের বিষয়টি ভুলে যেতে হবে। পশ্চিম আফ্রিকার এই দেশটিতে সরকার সব রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করার তিন মাস পর তিনি এ মন্তব্য করেন।
বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে সাংবাদিকদের সঙ্গে দীর্ঘ এক সাক্ষাৎকারে ট্রাওরে লিবিয়াকে উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। তার ভাষ্য, সেখানে বাইরের শক্তিগুলো গণতন্ত্র চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে।
ট্রাওরে বলেন, “মানুষকে গণতন্ত্রের বিষয়টি ভুলে যেতে হবে। আমাদের সত্য কথা বলতে হবে—গণতন্ত্র আমাদের জন্য নয়।”
ফরাসি সম্প্রচারমাধ্যম আরএফআইয়ের বরাতে তিনি আরও বলেন, “গণতন্ত্র হত্যা করে।”
তিনি বলেন, “লিবিয়ার দিকে তাকান—এটি আমাদের পাশের সবচেয়ে বড় উদাহরণ। পৃথিবীর যেখানেই তারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছে, সেখানেই রক্তপাত ঘটেছে। গণতন্ত্র হলো দাসত্ব।”
ইবরাহিম ট্রাওরে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে ক্ষমতায় আসেন। এর আট মাস আগে সংঘটিত এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট রশ মার্ক কাবোরের গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকার উৎখাত হয়।
সামরিক সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারা আল-কায়েদা ও আইএসআইএল-সংশ্লিষ্ট সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করবে। এসব গোষ্ঠী দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এখন বড় বড় এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। তবে এরপরও দেশটিতে হামলা অব্যাহত রয়েছে এবং লক্ষাধিক বেসামরিক মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে।
পশ্চিমবিরোধী বক্তব্যের কারণে আফ্রিকান প্রবাসীদের মধ্যে ব্যাপক প্রশংসা পাওয়া ট্রাওরে শুরুতে ২০২৪ সালে নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু এক বছর পর তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে এসে বলেন, বুরকিনা ফাসোর সব এলাকা ভোটদানের জন্য নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে না।
গত জানুয়ারিতে ট্রাওরে সরকার দেশটির ১০০টির বেশি রাজনৈতিক দল বিলুপ্ত করে এবং তাদের সম্পদ জব্দ করে।
ট্রাওরে ক্ষমতা গ্রহণের পরই পার্লামেন্ট এবং সব রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে স্বাধীন জাতীয় নির্বাচন কমিশনও বিলুপ্ত করা হয়। সরকার দাবি করে, সংস্থাটি পরিচালনায় ব্যয় অনেক বেশি।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, সরকার অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকেও লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে—যার মধ্যে গণমাধ্যম ও বিচারব্যবস্থাও রয়েছে।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সামরিক সরকারের সমালোচক সাংবাদিক, বিরোধীদলীয় নেতা এবং সরকারি কৌঁসুলিদের জোরপূর্বক সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে সম্মুখসারিতে পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। পরে তাদের মধ্যে কয়েকজনকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
প্রতিবেশী নাইজার ও মালিতেও রাজনৈতিক দলগুলোর বিরুদ্ধে একই ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সেসব দেশেও সামরিক সরকার ক্ষমতায় রয়েছে এবং তারাও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সহিংসতা মোকাবিলা করছে।
নির্বাচন আয়োজনের চাপের মুখে গত জানুয়ারিতে এই তিন দেশ পশ্চিম আফ্রিকার আঞ্চলিক জোট ইকোওয়াস থেকে বেরিয়ে গিয়ে ‘অ্যালায়েন্স অব সাহেল স্টেটস’ গঠন করে।
এ ছাড়া, তারা সাবেক ঔপনিবেশিক শক্তি ফ্রান্সকে সরিয়ে দেওয়ার পর রাশিয়ার আধাসামরিক বাহিনীর সহায়তা নিতে শুরু করেছে। সাহেল অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তার জন্য ফ্রান্স সেখানে প্রায় ৫ হাজার সেনা মোতায়েন করেছিল।
বুরকিনা ফাসোতে সহিংসতা অব্যাহত রয়েছে। ট্রাওরে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিন বছরে নিহতের সংখ্যা তিন গুণ বেড়ে গত মে মাস নাগাদ ১৭ হাজার ৭৭৫-এ পৌঁছেছে। এর আগের তিন বছরে মোট নথিভুক্ত মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ৬ হাজার ৬৩০। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘আফ্রিকা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর এক বিশ্লেষণে এ তথ্য উঠে এসেছে।
সূত্র: আল জাজিরা
Leave a comment