মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাব এবার দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে। আজারবাইজানের ভূখণ্ডে ড্রোন হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলায় একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি স্কুল ভবনের কাছেও বিস্ফোরণ ঘটেছে। এতে অন্তত দুইজন বেসামরিক নাগরিক আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে আজারবাইজান সরকার।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা এ তথ্য প্রকাশ করেছে। ঘটনাটিকে দেশটির সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে কঠোর প্রতিবাদ জানিয়েছে বাকু।
আজারবাইজানের সরকারি সূত্র জানায়, ইরান থেকে উৎক্ষেপণ করা বেশ কয়েকটি ড্রোন দেশটির আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার সতর্কতা সত্ত্বেও অন্তত দুটি ড্রোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানে।
এর মধ্যে একটি ড্রোন সরাসরি আঘাত করে নাখচিভান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের টার্মিনাল ভবনে। বিস্ফোরণের ফলে টার্মিনালের একটি অংশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। হামলার সময় বিমানবন্দরে কর্মরত কর্মচারী ও যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। জরুরি ভিত্তিতে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়।
অন্য একটি ড্রোন নাখচিভান অঞ্চলের শাকারাবাদ গ্রামের একটি স্কুল ভবনের পাশেই বিধ্বস্ত হয়। এতে আশপাশের কয়েকটি ভবনের জানালা ভেঙে যায় এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দেয়। এই ঘটনায় অন্তত দুইজন বেসামরিক নাগরিক আহত হন, যাদের স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
ঘটনার পরপরই আজারবাইজানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের আকাশসীমা লঙ্ঘন করে ড্রোন হামলা চালানো আন্তর্জাতিক আইন ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য গুরুতর হুমকি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, এই ঘটনার মাধ্যমে শুধু আজারবাইজানের নিরাপত্তাই নয়, পুরো দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের স্থিতিশীলতাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে এই হামলার জন্য দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
একই দিনে পারস্য উপসাগরের উত্তরাংশে আরেকটি উত্তেজনাপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে । ইরানের শক্তিশালী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী—ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি)—একটি মার্কিন তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার দাবি করেছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকালে এই হামলা চালানো হয়। আইআরজিসির এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পারস্য উপসাগর অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বাণিজ্যিক এবং সামরিক উপস্থিতির বিরুদ্ধে তারা কঠোর অবস্থান নিয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের সমর্থনকারী ইউরোপীয় দেশগুলোর কোনো সামরিক বা বাণিজ্যিক জাহাজকে এই সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
আইআরজিসি তাদের ঘোষণায় হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যদি কোনো বিদেশি জাহাজ এই পথ দিয়ে চলাচল করে, তবে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে। এই সতর্কবার্তা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের জন্য পারস্য উপসাগরীয় নৌপথে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পারস্য উপসাগর বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। এখানে উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আজারবাইজানে ড্রোন হামলা এবং একই দিনে মার্কিন ট্যাংকারে হামলার দাবি—দুটি ঘটনাই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দ্রুত বিস্তৃত হয়ে অন্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়ছে।
দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলটি ইতোমধ্যেই ভূরাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে নতুন করে সামরিক উত্তেজনা দেখা দিলে তা আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
Leave a comment