পবিত্র ঈদুল ফিতরকে সামনে রেখে নাড়ির টানে ঘরে ফেরার আনন্দে যখন মুখরিত হওয়ার কথা , ঠিক তখনই সেই যাত্রাপথে নেমে এসেছে এক গভীর শোকের ছায়া। সড়ক, রেল ও নৌপথ—তিন মাধ্যমেই ঘটেছে একের পর এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। বুধবার (১৮ মার্চ) দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া এসব দুর্ঘটনায় নারী ও শিশুসহ অন্তত ১০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। আহত হয়েছেন শতাধিক মানুষ, আর এখনো নিখোঁজ রয়েছেন দুইজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে- ঈদযাত্রার চাপ, অতিরিক্ত যাত্রী বহন, বেপরোয়া গতি ও অব্যবস্থাপনার সমন্বয়ে প্রতি বছরই এ সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়ে যায়। তবে চলতি বছর এই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে।
রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র ঢাকার সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘটে যায় এক মর্মান্তিক নৌদুর্ঘটনা। বিকেলে ঢাকা-ইলিশা রুটে যাত্রী ওঠানোর সময় ‘আসা যাওয়া-৫’ নামের একটি লঞ্চকে পেছন থেকে ধাক্কা দেয় ‘এমভি জাকির সম্রাট-৩’।
এই সংঘর্ষে মো. সোহেল (২২) নামে এক যুবক নিহত হন। গুরুতর আহত হন বোরা আক্তার নামে এক অন্তঃসত্ত্বা নারী, যিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নৌ পুলিশ জানিয়েছে, দুর্ঘটনার পর থেকেই দুইজন যাত্রী নিখোঁজ রয়েছেন এবং তাদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের দাবি, লঞ্চের অতিরিক্ত চাপ ও অসতর্ক নৌচালনার কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। ঈদকে কেন্দ্র করে সদরঘাটে যাত্রীচাপ বেড়ে যাওয়ায় নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে এসেছে।
একই দিনে রেলপথেও ঘটে বড় ধরনের দুর্ঘটনা। বগুড়া জেলার সান্তাহার জংশন স্টেশনের অদূরে নীলসাগর এক্সপ্রেস ট্রেনের নয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। ঢাকা থেকে চিলাহাটিগামী ট্রেনটি আদমদীঘির বাগমারি এলাকায় পৌঁছালে এ দুর্ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত ৬৬ জন যাত্রী আহত হন, যাদের মধ্যে ২০ জনকে নওগাঁ সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। এই দুর্ঘটনার ফলে ঢাকা-ঈশ্বরদী-দিনাজপুর-পঞ্চগড় রুটে ট্রেন চলাচল সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে যায়, যা ঈদযাত্রায় উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, সিগন্যাল নির্দেশনা যথাযথভাবে অনুসরণ না করাই দুর্ঘটনার মূল কারণ হতে পারে। রেলপথ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
সড়কপথে দুর্ঘটনার সংখ্যা ছিল সবচেয়ে বেশি। শেরপুর এলাকায় ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণে আগুন ধরে যায়। এতে চালকসহ তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। নিহতরা হলেন শিউলী বেগম (৪৮), তায়েবা খাতুন (১৫) এবং চালক রিন্টু (৪৭)। আহত হন অন্তত নয়জন। অন্যদিকে রাজশাহীর পুঠিয়ায় একটি বালুবাহী ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী চাচা কাওসার (২৬) এবং তার ছয় বছরের ভাতিজা রেদোয়ান নিহত হন। দুর্ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা ট্রাকটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।
কুমিল্লার বুড়িচং এলাকায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে দ্রুতগামী একুশে পরিবহনের একটি বাস উল্টে যায়। এতে অন্তত ১০ জন আহত হন, যার মধ্যে একটি জাতীয় দৈনিকের চিফ রিপোর্টার ইউসুফ আরেফিনও রয়েছেন। তাকে গুরুতর অবস্থায় ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এছাড়া দিনভর দেশের বিভিন্ন স্থানে ছোট-বড় আরও কয়েকটি দুর্ঘটনার খবর পাওয়া গেছে— ঝিনাইদহর মহেশপুরে তেলবাহী ট্রাকের ধাক্কায় ফুলঝুরি বেগম (৪৫) নিহত , শরীয়তপুরর ডামুড্যায় মাটিবাহী ট্রলির আঘাতে স্কুলছাত্র রমজান (৯) প্রাণ হারায়, টেকনাফে বাস ও সিএনজি সংঘর্ষে শিশু নাহিদ ইসলাম (৯) নিহত , এছাড়া চট্টগ্রামর পটিয়ায় দুই বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে বাঁশি মোহন দাশ নিহত হয়েছে
হাইওয়ে পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বলছে, অধিকাংশ দুর্ঘটনার পেছনে রয়েছে কিছু সাধারণ কারণ—বেপরোয়া গতি ,অতিরিক্ত যাত্রী ও ওভারলোড, ক্লান্ত চালক, যানবাহনের ত্রুটি ,ট্রাফিক আইন অমান্য ঈদযাত্রার সময় এই সমস্যাগুলো আরও প্রকট হয়ে ওঠে, কারণ স্বল্প সময়ে বিপুল সংখ্যক মানুষ যাতায়াত করে।
এসব পদক্ষেপ জরুরি ভিত্তিতে না নিলে ভবিষ্যতেও এমন প্রাণহানি অব্যাহত থাকবে। দুর্ঘটনাগুলোর পর স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রম চালায়। আহতদের নিকটস্থ হাসপাতালগুলোতে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর আহতদের রাজধানীতে স্থানান্তর করা হচ্ছে। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে নৌ পুলিশ ও ডুবুরি দল কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
প্রতিটি ঘটনায় সংশ্লিষ্ট থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত চলছে। পুলিশ জানিয়েছে, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ঈদ মানেই আনন্দ, পরিবার আর ভালোবাসার মিলনমেলা। কিন্তু সেই আনন্দের পথ যদি হয়ে ওঠে মৃত্যুফাঁদ, তাহলে তা শুধু ব্যক্তিগত নয়—জাতীয় এক ট্র্যাজেডি। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ, কঠোর আইন প্রয়োগ এবং সর্বোপরি জনসচেতনতা। নইলে প্রতি বছর ঈদের আগে-পরে এমন শোকের মিছিল থামানো কঠিন হয়ে পড়বে।
Leave a comment