মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অবস্থানকে আরও শক্তিশালী ও অনমনীয় করে তুলেছে। উত্তর কোরিয়ার সুপ্রিম পিপলস অ্যাসেম্বলিতে দেওয়া এক নীতি-নির্ধারণী ভাষণে কিম জং উন স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি প্রমাণ করে যে পিয়ংইয়ংয়ের পারমাণবিক অস্ত্র রাখার সিদ্ধান্তটিই ছিল কৌশলগতভাবে সঠিক। সিএনএন-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, কিম ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপকে ‘সন্ত্রাসবাদ ও আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
কিম জং উন তার ভাষণে উল্লেখ করেন, অতীতে পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘মিষ্টি কথা’ বা কূটনৈতিক চাপ প্রত্যাখ্যান করে উত্তর কোরিয়া যে পথে হেঁটেছে, তা আজ আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে যৌক্তিক বলে প্রমাণিত। তিনি ঘোষণা করেন,
উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্রের মর্যাদা এখন ‘অপরিবর্তনীয়’ এবং চিরস্থায়ী। কিমের এই মন্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, ভবিষ্যতে ওয়াশিংটনের সঙ্গে কোনো আলোচনা হলেও তা আর ‘নিরস্ত্রীকরণ’ কেন্দ্রিক হবে না; বরং উত্তর কোরিয়া নিজেকে একটি স্বীকৃত পারমাণবিক শক্তি হিসেবেই টেবিলের অপর প্রান্তে দেখতে চায়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা ধ্বংসের দাবি তুলে দেশটিতে সামরিক অভিযান চালাচ্ছেন, কিম জং উন একে একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করেছেন। পিয়ংইয়ংয়ের বিশ্বাস, যেসব দেশের কাছে শক্তিশালী পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেই, তারাই মার্কিন সামরিক শক্তির সহজ শিকারে পরিণত হয়। ফলে নিজের অস্তিত্ব রক্ষায় পারমাণবিক অস্ত্রকেই একমাত্র ‘রক্ষাকবচ’ হিসেবে বিবেচনা করছে কিম প্রশাসন।
কেবল অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধিই নয়, উত্তর কোরিয়া এখন রাশিয়ার সঙ্গে একটি শক্তিশালী কৌশলগত সামরিক জোট গঠন করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার সমর্থনে কামানের গোলা, রকেট এবং হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে পিয়ংইয়ং বিশ্ব রাজনীতিতে নিজেদের নতুন মেরুকরণ জানান দিচ্ছে। বিনিময়ে মস্কো থেকে প্রয়োজনীয় খাদ্য, জ্বালানি এবং স্পর্শকাতর সামরিক প্রযুক্তি লাভ করছে উত্তর কোরিয়া, যা তাদের অস্ত্রভাণ্ডারকে আরও আধুনিক ও বিধ্বংসী করে তুলছে।
কৌশলগত এই অনমনীয়তার পাশাপাশি কিম জং উন তার কিশোরী কন্যা কিম জু আয়ে-কে বিভিন্ন সামরিক মহড়ার কেন্দ্রে নিয়ে আসছেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এর মাধ্যমে কিম বিশ্বকে এই বার্তাই দিচ্ছেন যে—উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি কোনো সাময়িক বিষয় নয়, এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকবে। যদিও কিম কূটনীতির দরজা একেবারে বন্ধ করেননি, তবে তার শর্ত অত্যন্ত পরিষ্কার: উত্তর কোরিয়াকে একটি ‘পারমাণবিক শক্তিধর দেশ’ হিসেবে পূর্ণ স্বীকৃতি দিতে হবে যুক্তরাষ্ট্রকে এবং পিয়ংইয়ংয়ের প্রতি ‘শত্রুতামূলক নীতি’ ত্যাগ করতে হবে।
Leave a comment