কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টাইনকে ঘিরে চলমান আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ সম্প্রতি বিপুল পরিমাণ নথিপত্রের আরও একটি অংশ প্রকাশ করেছে। এসব নথিতে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত কয়েকজন ব্যক্তিত্বের নাম উঠে আসায় বিশ্বজুড়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তবে আইনি বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলছেন—কোনো নথিতে নাম থাকা মানেই অপরাধে জড়িত থাকা নয়; প্রেক্ষাপট, প্রমাণ ও যাচাই এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রকাশিত কাগজপত্রে প্রযুক্তি খাতের শীর্ষ ব্যক্তিত্ব, সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ এবং সামাজিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদের উল্লেখ রয়েছে বলে জানা গেছে। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে মাইক্রোসফটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস, টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক এবং খ্যাতিমান চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ারের নাম আলোচনায় এসেছে। তবে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো নতুন ফৌজদারি অভিযোগ আনা হয়েছে—এমন তথ্য প্রকাশিত হয়নি।
প্রকাশিত নথির অংশ হিসেবে এপস্টাইনের ব্যক্তিগত খসড়া ই-মেইলের উল্লেখ পাওয়া গেছে বলে কিছু প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। সেখানে বিল গেটসের ব্যক্তিজীবন সম্পর্কিত কিছু অভিযোগের কথা বলা হয়েছে। তবে গেটসের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করা হয়েছে। তার এক মুখপাত্র বলেছেন, অভিযোগগুলো “সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন” এবং এগুলোর পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই।
আইনি পর্যবেক্ষকদের মতে, এপস্টাইন অতীতে নিজের প্রভাব বিস্তার ও সামাজিক অবস্থান বাড়াতে পরিচিত ব্যক্তিদের নাম ব্যবহার করতেন—এমন অভিযোগ বহুবার উঠেছে। ফলে তার ব্যক্তিগত বক্তব্য বা দাবিকে যাচাই ছাড়া গ্রহণ করা ঝুঁকিপূর্ণ।
প্রকাশিত নথিতে ২০০৯ সালের একটি সামাজিক অনুষ্ঠানের প্রসঙ্গও উঠে এসেছে বলে জানা গেছে, যেখানে ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল—যিনি পরবর্তীতে যৌন পাচার সংক্রান্ত মামলায় দণ্ডিত হন—একটি নৈশভোজের আয়োজন করেছিলেন। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই সময় নিজের চলচ্চিত্র “Amelia”–এর প্রচারণার সময় মীরা নায়ার ওই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন।
তবে কোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি মানেই অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে জ্ঞাত থাকা বা তাতে অংশ নেওয়া—এমনটি ধরে নেওয়া যায় না বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। চলচ্চিত্র, ব্যবসা বা কূটনৈতিক অঙ্গনে এ ধরনের নেটওয়ার্কিং ইভেন্টে বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষ অংশ নেন, যা অনেক সময় পরবর্তীতে বিতর্কের জন্ম দেয়।
ইলন মাস্কের নামও কিছু প্রতিবেদনে এসেছে, যদিও তিনি এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেছেন—এমন তথ্য পাওয়া যায়নি। অতীতে এপস্টাইন-সম্পর্কিত প্রশ্নে মাস্ক যে কোনো ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের বিষয় অস্বীকার করেছিলেন।
এই নথি প্রকাশ কোনো একক ঘটনার ফল নয়; বরং বহু বছরের আইনি লড়াই, ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে স্বচ্ছতার দাবি এবং গণমাধ্যমের চাপের পর আদালতের নির্দেশে ধাপে ধাপে এসব তথ্য উন্মুক্ত করা হচ্ছে। এতে রয়েছে সাক্ষ্যবয়ান, ই-মেইল অংশ, যোগাযোগ তালিকা, আইনি নথি এবং অন্যান্য উপাত্ত।
আইনবিদরা বলছেন, এ ধরনের বিশাল নথিপত্রে যাচাইকৃত প্রমাণের পাশাপাশি অভিযোগ, গুজবসদৃশ দাবি বা প্রসঙ্গবিচ্ছিন্ন তথ্যও থাকতে পারে। তাই দায়িত্বশীলভাবে বিশ্লেষণ ও প্রতিবেদন করা জরুরি।
২০০৮ সালে অপ্রাপ্তবয়স্কদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগে প্রথম আইনি জটিলতায় পড়েন জেফ্রি এপস্টাইন। ২০১৯ সালে নতুন করে গ্রেপ্তারের পর বিচার শুরুর আগেই নিউইয়র্কের কারাগারে তার মৃত্যু হয়। তার সহযোগী ঘিসলাইন ম্যাক্সওয়েল পরবর্তীতে দোষী সাব্যস্ত হন। এই ঘটনাপ্রবাহ ক্ষমতা, অর্থ ও প্রভাবের জটিল নেটওয়ার্ক নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রশ্ন তোলে।
প্রতিবার নতুন নথি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে জনমত উত্তপ্ত হলেও বিশেষজ্ঞরা একটি বিষয় মনে করিয়ে দিচ্ছেন—আইনি নথিতে উল্লেখ থাকা আর আদালতে প্রমাণিত দায় সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। অভিযোগ, অস্বীকার এবং যাচাই—এই তিনটি স্তর স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সব মিলিয়ে, সর্বশেষ প্রকাশিত নথিগুলো আবারও দেখিয়ে দিল—এপস্টাইন কাণ্ড কেবল একটি অপরাধ মামলা নয়; এটি ক্ষমতার বলয়, সামাজিক যোগাযোগ এবং বিচারপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি বৈশ্বিক বিতর্কের অংশ।
Leave a comment