২০০৯ সালের ঘটনা মেক্সিকোর মন্টেরিতে এক তরুণী মডেল, গ্যাব্রিয়েলা রিকো জিমেনেজ, হোটেলের সামনে কাঁপতে কাঁপতে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেছিলেন। তিনি দাবি করেছিলেন, একটি অভিজাত পার্টি থেকে পালিয়ে আসার সময় তিনি এমন কিছু দেখেছেন যা স্বাভাবিক মানুষের কল্পনারও বাইরে। তিনি বলেন, তারা মানুষের মাংস খাচ্ছিল ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার কয়েকদিনের মধ্যে গ্যাব্রিয়েলা উধাও হন, এবং আজও তাঁর কোনো হদিস নেই। সেই সময় তাঁকে হয়তো মানসিক অস্থিরতা বা ড্রাগের প্রভাবে বিভ্রান্ত বলে উড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে—তিনি কি সত্যিই এমন কিছু দেখেছিলেন যা সাধারণ মানুষের জন্য অজানা ছিল?
ক্ষমতা, অর্থ এবং যৌনতা: এক বিষাক্ত জট-
বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী অস্ত্র হলো অর্থ ও যৌনতা। এই দুইয়ের সমন্বয় তৈরি করে এমন একটি জট, যা রাষ্ট্রপ্রধান থেকে শুরু করে মিডিয়া ব্যক্তিত্ব পর্যন্ত সবাইকে প্রভাবিত করতে পারে। এপস্টেইনের মতো বিলিয়নিয়াররা এই জটের কেন্দ্রে থেকে নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছেন। তাঁরা যে ধরনের যৌন অপরাধ, অমানবিক রিচুয়াল এবং বিকৃত আচরণ করেছেন, তা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে।
জেফ্রি এপস্টেইন এবং গোপন নেটওয়ার্ক-
এপস্টেইন প্রকাশ্যে ছিলেন ধনকুবেরদের অর্থ ব্যবস্থাপক। কিন্তু আড়ালে তিনি তৈরি করেছিলেন এক সুসংগঠিত নেটওয়ার্ক, যেখানে অল্পবয়সী কিশোরীদের প্রলুব্ধ করে আরও কিশোরী আনা হতো। তাঁর ব্যক্তিগত দ্বীপ ও বিলাসবহুল বাড়িতে “ম্যাসাজের আড়ালে” চলত যৌন নিপীড়ন। ভুক্তভোগীদের বর্ণনা অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি পদ্ধতিগত কাঠামো।
গিসলেইন ম্যাক্সওয়েল ছিলেন এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী, যার বাবা ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। এপস্টেইনের ঘনিষ্ঠ তালিকায় ডোনাল্ড ট্রাম্প, বিল ক্লিনটন, বিল গেটস, ইলন মাস্কের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এসেছে। যদিও তদন্তে সরাসরি অপরাধ প্রমাণিত হয়নি, ফ্লাইট লগ ও অন্যান্য নথি প্রশ্ন তোলে—এ সবই কি কাকতালীয়?
বিচারহীনতা এবং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি-
২০০৫ সালে প্রথম অভিযোগ উঠলে, এফবিআইয়ের হাতে থাকা বহু অভিযোগ ও ৫৩ পৃষ্ঠার চার্জশিট থাকা সত্ত্বেও এপস্টেইন মাত্র ১৮ মাসের কারাদণ্ড ভোগ করেন, তাও বিশেষ সুবিধার সঙ্গে। সেই সময়ের অ্যাটর্নি জেনারেল আলেকজান্ডার অ্যাকোস্টা(যিনি পরে ট্রাম্প প্রশাসনের মন্ত্রী হন ) এই চুক্তির মূল ব্যক্তি ছিলেন। ২০১৯ সালে কারাগারে তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু বিচার প্রক্রিয়াকে আরও জটিল করে তোলে। নজরদারির ফাঁক, অকার্যকর ক্যামেরা, হারানো ফুটেজ—সব মিলিয়ে নেটওয়ার্কের বড় অংশ অন্ধকারে রয়ে যায়।
বিকৃত রিচুয়াল ও নিয়ন্ত্রণের কৌশল-
সাবেক গোয়েন্দা কর্মকর্তা এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকদের মতে, এপস্টেইনের কর্মকাণ্ড কেবল যৌন অপরাধ ছিল না। এটি ছিল ভয়, লজ্জা এবং ব্ল্যাকমেইলের মাধ্যমে ক্ষমতাশালীদের উপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার কৌশল। ধীরে ধীরে আরও ভয়াবহ তথ্য সামনে আসতে থাকে। গোপন কাল্ট, বিকৃত রিচুয়াল, এমন কিছু চর্চা যা সাধারণ মানুষের নৈতিকতার সম্পূর্ণ বাইরে। অ্যাপস্টেইন নথিতে এক ভিকটিম দাবি করেছেন, তিনি নিজ চোখে এক বাচ্চা শিশুকে ছিঁড়ে ফেলতে এবং তার অন্ত্রের বর্জ্য খেতে দেখেছেন।
পশ্চিমা সমাজের ভয়ংকর রূপ-
পশ্চিমা সমাজ নৈতিকতা, নারী অধিকার ও মানবাধিকারের কথা বলে। কিন্তু একই সময়ে, এই সমাজের ভেতরে নারী ও শিশুদের প্রতি সবচেয়ে অমানবিক আচরণ ঘটেছে। আইন সব সময় সমানভাবে প্রয়োগ হয় না; প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কাছে এটি প্রায়শই নতজানু থাকে। গ্যাব্রিয়েলা রিকো হয়তো এক মুহূর্তের জন্য এই পর্দা সরিয়েছিলেন, কিন্তু তারপরই তিনি হারিয়ে গিয়েছিলেন। এপস্টেইন ধরা পড়লেও পুরো সিস্টেম আজও অক্ষত আছে।
জেফ্রি এপস্টেইনের ঘটনা একক ব্যক্তির কাহিনি নয়। এটি একটি কাঠামো, যেখানে অর্থ, ক্ষমতা ও যৌন নিপীড়নের সংমিশ্রণ সমাজের অন্ধকার দিককে প্রকাশ করে। যতক্ষণ এই কাঠামো অক্ষত থাকবে, ততক্ষণ এই অন্ধকার গল্পের শেষ হবে না। ভুক্তভোগীদের কণ্ঠই এই সত্যকে উদঘাটন করতে পারে।

Leave a comment