ভারতের রাজস্থানে বিয়ের মাত্র তিন মাসের মাথায় স্বামীকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে এক নববধূকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনাটি ইতোমধ্যে দেশটির গণমাধ্যমে ‘হানিমুন মার্ডার’ নামে আলোচিত হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, প্রেমিক ও তার সহযোগীদের সহায়তায় স্বামীকে হত্যার ছক কষেছিলেন অভিযুক্ত ওই নারী। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, অভিযুক্ত নববধূ অঞ্জলির সঙ্গে প্রায় সাত বছর আগে একটি বিয়ের অনুষ্ঠানে সঞ্জয় নামের এক যুবকের পরিচয় হয়েছিল। পরিচয়ের পর সময়ের ব্যবধানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও ২০২৪ সালে দুজনের মধ্যে আবারও যোগাযোগ শুরু হয়। পরবর্তীতে সেই যোগাযোগ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে রূপ নেয়। তবে পারিবারিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালের ৩০ অক্টোবর রাজস্থানের রাওলা এলাকার বাসিন্দা আশিস কুমারের সঙ্গে অঞ্জলির বিয়ে হয়।
বিয়ের পর দাম্পত্য জীবনে অঞ্জলি অসন্তুষ্ট ছিলেন বলে জানা গেছে। তার আগের প্রেমের সম্পর্ক শেষ না হওয়ায় দাম্পত্য কলহ তৈরি হয়। তদন্ত কর্মকর্তাদের দাবি, বিয়ের পরও অঞ্জলি প্রেমিক সঞ্জয়ের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখেন এবং ধীরে ধীরে স্বামীকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করেন।
পুলিশ জানায়, ঘটনার প্রায় ১৬ দিন আগে অঞ্জলি বাবার বাড়িতে যান। সেখানেই প্রেমিক সঞ্জয়ের সঙ্গে দেখা করে স্বামী আশিস কুমারকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডকে ছিনতাই বা ডাকাতির ঘটনা হিসেবে সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, যাতে সন্দেহ অন্যদিকে চলে যায়।
ঘটনার দিন ৩০ জানুয়ারি রাতে খাবার শেষে অঞ্জলি স্বামীকে নিয়ে হাঁটতে বের হন। হাঁটার সময় মোবাইল ফোনে প্রেমিক সঞ্জয়কে নিজেদের অবস্থান জানিয়ে দেন তিনি। পুলিশের ভাষ্যমতে, নির্ধারিত স্থানে আগে থেকেই অবস্থান করছিল সঞ্জয় ও তার দুই সহযোগী।
সেই স্থানে পৌঁছানোর পর আশিস কুমারের ওপর অতর্কিত হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা প্রথমে তাকে লাঠি দিয়ে মারধর করে এবং পরে গলায় মাফলার পেঁচিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পুরো ঘটনায় অঞ্জলি সরাসরি উপস্থিত ছিলেন এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করেন বলে পুলিশের অভিযোগ।
ঘটনার পর হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতির ঘটনা হিসেবে দেখাতে অঞ্জলি নিজের কানের দুল ও স্বামীর মোবাইল ফোন হামলাকারীদের হাতে তুলে দেন। এরপর তিনি নিজেকে অচেতন দেখানোর চেষ্টা করেন। স্থানীয়রা খবর পেয়ে আশিস কুমারকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি ছিনতাই বা পথচারী হামলার ঘটনা বলে মনে হলেও ময়নাতদন্ত রিপোর্টে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে আসে। প্রতিবেদনে দেখা যায়, আশিস কুমারের মাথায় গুরুতর আঘাতের চিহ্ন রয়েছে এবং মৃত্যুর কারণ শ্বাসরোধ। এই তথ্য পাওয়ার পরই পুলিশ তদন্তের গতিপথ পরিবর্তন করে এবং ঘটনার পেছনে পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বিষয়টি খতিয়ে দেখতে শুরু করে।
তদন্তে অঞ্জলির আচরণ, বক্তব্যের অসঙ্গতি এবং ফোন কলের তথ্য পুলিশকে সন্দেহের দিকে নিয়ে যায়। কল রেকর্ড ও অবস্থান সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে, হত্যাকাণ্ডটি পূর্বপরিকল্পিত। এরপর অঞ্জলি, তার প্রেমিক সঞ্জয় এবং আরও দুই সহযোগীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, তিনজন পুরুষ অভিযুক্তকে পাঁচ দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে, যাতে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং অন্যান্য সম্ভাব্য জড়িতদের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে অঞ্জলিকে দুই দিনের রিমান্ড শেষে আদালতের নির্দেশে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
এই ঘটনাটি রাজস্থানসহ ভারতের বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সংবাদমাধ্যমে ‘হানিমুন মার্ডার’ নিয়ে চলছে তীব্র আলোচনা। অনেকেই এটিকে পারিবারিক সম্পর্কের ভাঙন, গোপন সম্পর্ক এবং অপরাধের ভয়াবহ পরিণতির উদাহরণ হিসেবে দেখছেন।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলছে, তদন্ত এখনও চলমান এবং প্রয়োজন হলে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। পুলিশ আশা করছে, রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার চার্জশিট দ্রুত প্রস্তুত করা সম্ভব হবে।
Leave a comment