পাকিস্তানের একটি বিশেষ আদালত তোশাখানা-২ দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এবং তার স্ত্রী বুশরা বিবিকে ১৭ বছর করে কারাদণ্ড দিয়েছেন। শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) ঘোষিত এই রায়ে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি এ তথ্য জানিয়েছে।
৭৩ বছর বয়সী ইমরান খান ইতোমধ্যে ২০২৩ সালের আগস্ট থেকে বিভিন্ন মামলায় কারাগারে রয়েছেন। ২০২২ সালের এপ্রিলে অনাস্থা ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দায়ের করা হয়। তোশাখানা-২ মামলাটি সেই ধারাবাহিকতারই একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
রাওয়ালপিন্ডির উচ্চ-নিরাপত্তাসম্পন্ন আদিয়ালা কারাগারে স্থাপিত বিশেষ আদালতের বিচারক শাহরুখ আরজুমান্দ এই রায় ঘোষণা করেন। বর্তমানে পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)-এর প্রতিষ্ঠাতা ইমরান খান এই কারাগারেই বন্দী রয়েছেন। রায় ঘোষণার সময় ইমরান খান ও বুশরা বিবি দুজনই আদালতে উপস্থিত ছিলেন।
আদালতের রায়ে বলা হয়, পাকিস্তান দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা অনুযায়ী (বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে) ইমরান খান ও বুশরা বিবিকে ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন ধারায় তাদের আরও ৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এর সঙ্গে প্রত্যেককে ১৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন পাকিস্তানি রুপি জরিমানাও করা হয়েছে।
রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে, সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে আদালত ইমরান খানের বয়স এবং বুশরা বিবি একজন নারী—এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়েছে। এই দুটি বিষয় মাথায় রেখেই আদালত তুলনামূলকভাবে ‘নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি’ গ্রহণ করেছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়।
এছাড়া ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮২-বি ধারার সুবিধাও দণ্ডিতদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ, বিচারাধীন অবস্থায় তারা যে সময় কারাগারে ছিলেন, তা সাজা হিসাবের ক্ষেত্রে গণনায় আসবে। মামলার শুনানিকালে মোট ২১ জন সাক্ষী আদালতে জবানবন্দি দেন।
ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৪২ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে ইমরান খান তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি আদালতে দাবি করেন, এই মামলা ‘বিদ্বেষপূর্ণ, বানোয়াট এবং সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’। তার মতে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থেকেই তাকে এবং তার স্ত্রীকে লক্ষ্য করে এসব মামলা করা হয়েছে।
এই মামলাটি ২০২৪ সালের জুলাই মাসে দায়ের করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, ২০২১ সালে সৌদি সরকারের কাছ থেকে পাওয়া দামি ঘড়ি, হীরা ও সোনার অলঙ্কারসহ বিভিন্ন মূল্যবান রাষ্ট্রীয় উপহার নিয়ম অনুযায়ী তোশাখানায় জমা না দিয়ে ওই দম্পতি বিক্রি করে দেন। অথচ আইন অনুযায়ী এসব উপহার তোশাখানায় জমা দিয়ে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরে তা কেনার সুযোগ ছিল।
এ বিষয়ে পাকিস্তানের অর্থ প্রতিমন্ত্রী বিলাল আজহার কায়ানি জিও নিউজকে বলেন, উপহারগুলো তোশাখানায় জমা দেওয়া ছিল ইমরান খান ও বুশরা বিবির আইনি বাধ্যবাধকতা। তিনি জানান, তদন্তে উঠে এসেছে—একটি অলঙ্কার সেটের প্রকৃত মূল্য ছিল প্রায় ৭০ মিলিয়ন রুপি, কিন্তু সেটির মূল্যায়ন দেখানো হয়েছিল মাত্র ৫.৮ থেকে ৫.৯ মিলিয়ন রুপি। তার ভাষায়, “দুর্ভাগ্যজনকভাবে তারা পানির দরে সেই সেটটি কেনার চেষ্টা করেছিলেন।”
উল্লেখ্য, তোশাখানা হলো পাকিস্তানের ক্যাবিনেট ডিভিশনের অধীন একটি বিভাগ, যেখানে বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছ থেকে পাওয়া রাষ্ট্রীয় উপহার সংরক্ষণ করা হয়। নিয়ম অনুযায়ী, এসব উপহার প্রথমে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে জমা দিতে হয়।
২০২৪ সালের অক্টোবরে ইসলামাবাদ হাইকোর্ট এই মামলায় বুশরা বিবিকে জামিন দেন। এক মাস পর একই মামলায় ইমরান খানও জামিন পান। তবে গত বছরের ডিসেম্বরে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয় এবং আদিয়ালা কারাগারেই বিচার কার্যক্রম চলতে থাকে। এর আগেই আল-কাদির ট্রাস্ট মামলায় দণ্ডিত হয়ে তারা কারাগারে ছিলেন।
এই রায়ের বিরুদ্ধে ইমরান খান ও বুশরা বিবি হাইকোর্টে আপিল করতে পারবেন বলে আইন বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন। তবে এরই মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে থাকা ইমরান খানের সঙ্গে সাক্ষাতে এক মাসেরও বেশি সময় ধরে অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। সর্বশেষ ২ ডিসেম্বর তার বোন উজমা খান তার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি পেয়েছিলেন।
এদিকে জাতিসংঘের নির্যাতনবিষয়ক বিশেষ দূত অ্যালিস জিল এডওয়ার্ডস সম্প্রতি ইমরান খানের কারাবন্দিত্বের অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি পাকিস্তান সরকারকে অবিলম্বে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ইমরান খানের কথিত ‘নির্জন কারাবাস’ তার শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য গুরুতর ক্ষতিকর হতে পারে।
২০১৮ সালের আগস্ট থেকে ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত পাকিস্তানের ১৯তম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইমরান খানের বিরুদ্ধে এই রায় দেশটির রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে ইতোমধ্যেই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
Leave a comment