জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে আশুলিয়ায় সাতজনকে হত্যা ও ছয়জনের লাশ পোড়ানোর ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি) সাইফুলকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ (আইসিটি-২)। বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) ঘোষিত এ রায় দেশের সাম্প্রতিক ট্রাইব্যুনাল ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ রায় ঘোষণা করেন। প্যানেলের অন্য দুই সদস্য ছিলেন বিচারপতি মো. মঞ্জুরুল বাছিদ এবং বিচারপতি নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। দীর্ঘ শুনানি, সাক্ষ্যগ্রহণ এবং যুক্তিতর্ক পর্যালোচনার পর আদালত এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়।
রাষ্ট্রপক্ষের অভিযোগ অনুযায়ী, আশুলিয়ায় সংঘটিত সহিংসতায় সাতজনকে হত্যা করা হয় এবং তাদের মধ্যে ছয়জনের মরদেহ আগুনে পুড়িয়ে প্রমাণ নষ্টের চেষ্টা করা হয়। প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়, ঘটনাটি ছিল পরিকল্পিত এবং সংঘবদ্ধ, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পড়ে।উপস্থাপিত সাক্ষ্য, নথি ও পরিস্থিতিগত প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগগুলো প্রমাণিত হয়েছে বলে আদালত রায়ে উল্লেখ করে।
এটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ সংশ্লিষ্ট মামলাগুলোর মধ্যে তৃতীয় রায়। গত রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) আদালত ৫ ফেব্রুয়ারি রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেন। এর আগে ২০ জানুয়ারি উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখা হয়।
প্রসিকিউশনের পক্ষে ১৪ ও ১৫ জানুয়ারি যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন প্রসিকিউটর মো. মিজানুল ইসলাম ও চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম। তারা আদালতে উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও আলামতের ভিত্তিতে আসামিদের অপরাধ সংঘটনের দায় প্রমাণিত হয়েছে বলে দাবি করেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাগুলো ছিল বৃহত্তর সহিংস অভিযানের অংশ।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী সৈয়দ মিজানুর রহমান এবং এস. এম. মিরাজুল আলম আজমান প্রতিরক্ষার পক্ষে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। তারা তদন্ত প্রক্রিয়া, সাক্ষ্যপ্রমাণের গ্রহণযোগ্যতা এবং ঘটনার বর্ণনা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তবে আদালত তাদের যুক্তিকে পর্যাপ্ত মনে করেননি।
মামলায় একাধিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যের নামও এসেছে। গ্রেফতার হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ঢাকা জেলার সাবেক অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. আব্দুল্লাহিল কাফী, ঢাকা জেলা পুলিশের সাবেক অতিরিক্ত সুপার (সাভার সার্কেল) মো. শাহিদুল ইসলাম, পরিদর্শক মো. আরাফাত হোসেন, এসআই আবদুল মালেক, এসআই আরাফাত উদ্দিন, এএসআই কামরুল হাসান, শেখ আবজালুল হক এবং কনস্টেবল মুকুল চোকদার।
তবে সাবেক এমপি সাইফুলসহ মোট আটজন আসামি এখনো পলাতক রয়েছেন। ট্রাইব্যুনালের বিধান অনুযায়ী, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধেও বিচার কার্যক্রম পরিচালিত হতে পারে।
গত বছরের ২১ আগস্ট এ মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে বিচার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। সে সময় আদালতে উপস্থিত আট আসামির মধ্যে সাতজন নিজেদের নির্দোষ দাবি করেন। তবে এসআই শেখ আবজালুল হক দোষ স্বীকার করে রাজসাক্ষী হিসেবে সাক্ষ্য দেন। তার সাক্ষ্য মামলার প্রমাণ উপস্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ বলে আদালতে উল্লেখ করা হয়।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ রায় মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ। তবে মৃত্যুদণ্ডের রায় উচ্চতর আদালতে আপিলযোগ্য। ফলে মামলার চূড়ান্ত আইনি নিষ্পত্তি এখনো বাকি।
Leave a comment