সিলেট-৫ (জকিগঞ্জ-কানাইঘাট) আসনে বিএনপি নিজ দলের ধানের শীষের কোন প্রার্থী না দিয়ে এখানে সমর্থন দিয়েছে জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সভাপতি খেজুর গাছ প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে। তবে এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে এখানে ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন সিলেট জেলা বিএনপি’র সহ সভাপতি মামুনুর রশীদ চাকসু মামুন। চাকসু মামুন নামের ওই বিএনপি নেতাই এখন জমিয়ত প্রার্থীকে চরম বিপাকে ফেলে দিয়েছেন। তবে মামুনুর রশীদ দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তাকে বিএনপি বহিষ্কার করেছে।
বিগত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির জোটসঙ্গী হিসেবে মনোনয়ন পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন জমিয়তের মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। সেবার মামুনুর রশীদ বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন পেলেও জোট রাজনীতির ভাগ-বাঁটোয়ারার অংশ হিসেবে শেষ পর্যন্ত উবায়দুল্লাহ ফারুক চূড়ান্ত মনোনয়ন পান। এবারও দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে মামুনুর রশীদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হন।
অন্যদিকে, আসনটিতে জামায়াতের প্রার্থী ছিলেন সিলেট জেলার নায়েবে আমির মাওলানা হাফিজ আনওয়ার হোসাইন খাঁন। তবে, ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এখানে খেলাফত মজলিসের সিলেট জেলার উপদেষ্টা মাওলানা মুফতি আবুল হাসান চূড়ান্ত মনোনয়ন পাওয়ায় জামায়াতের প্রার্থী শেষ মুহূর্তে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেন। জামায়াত প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহারের পরপরই জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীসহ এনসিপি ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস নেতৃবৃন্দ এ আসনে দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসানের পক্ষে মাঠে ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে মুহুর্তেই ভোটের মাঠের দৃশ্যপট পাল্টে এগারো দলীয় ঐক্যের প্রার্থী মুফতি আবুল হাসান মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় চলে আসেন।
সিলেটের রাজনীতি সচেতন ব্যক্তিদের ধারণা, সিলেট-৫ আসনে মুফতি আবুল হাসান, মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক ও মামুনুর রশীদের মধ্যে ত্রিমুখী হাড্ডাহাড্ডি লড়াই’র সম্ভাবনা দেখা গেলেও মূলত ভোটের মাঠে জনপ্রিয়তায় অনেক এগিয়ে রয়েছেন এগারো দলীয় জোটের দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী মাওলানা মুফতি আবুল হাসান। বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী স্থানীয় বিএনপির রাজনীতিতে ব্যাপক জনপ্রিয়। বিএনপির একটা বড় অংশ গোপনে এবং প্রকাশ্যে তাঁর সঙ্গে আছে। এ অবস্থায় বিএনপি জোটের প্রার্থী কেন্দ্রীয় জমিয়ত সভাপতি মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুককে একটু চাঁপে থাকতে হচ্ছে। এ দিক বিবেচনায় জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটভুক্ত শরিক দলগুলো ঐক্যবদ্ধ থাকায় মুফতি আবুল হাসান বেশ সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।
সিলেট-৫ আসনে দুই জোটের দুই আলেম প্রার্থী ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী চাকসু মামুন ছাড়াও বাংলাদেশ মুসলিম লীগের মাওলানা বিলাল উদ্দিন (হারিকেন প্রতীক) নিয়ে নির্বাচন করছেন। তবে এই প্রার্থীর তেমন কোন প্রচার-প্রচারণা বা গণসংযোগ দেখা যাচ্ছে না।
এ বিষয়ে ১১-দলীয় জোটের প্রার্থী মাওলানা মুফতি আবুল হাসান বলেন, কানাইঘাট-জকিগঞ্জের মানুষ আমাকে যেভাবে কাছে টেনে নিচ্ছে, তাতে ধরে নেয়া যায় আল্লাহ পাক আমাকে এ অঞ্চলের মানুষের খাদিম হিসেবে কবুল করেছেন। এগারো দলের নেতাকর্মী ছাড়াও আপামর জনতা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিজেদের টাকা-পয়সা ব্যায় করে দিনরাত মাঠে ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। তাই আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি দেওয়াল ঘড়ি প্রতীকের বিজয় সুনিশ্চিত ইনশাআল্লাহ।
এদিকে, স্থানীয় বিএনপির একাধিক নেতা-কর্মী বলেন, জকিগঞ্জ ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপি এবং দলটির অঙ্গসহযোগী সংগঠনের একটা বড় অংশ মামুনুর রশীদের সঙ্গে থেকে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় অংশ নিচ্ছেন। ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীর সঙ্গে থাকায় গত শনিবার জকিগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ইসমাইল হোসেন (সেলিম), যুগ্ম সম্পাদক মাসুক আহমদ, সাংগঠনিক সম্পাদক হাসান আহমদ, সদস্য রিপন আহমদ ও কানাইঘাট উপজেলা বিএনপির সহ সভাপতি ওয়েছ আহমদ বহিষ্কৃত হন। আরও কয়েকজনকে বহিষ্কার করা হতে পারে বলে দলের কয়েকজন দায়িত্বশীল নেতা জানিয়েছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থীর সঙ্গে দলের অনেক নেতা-কর্মী আছেন। শোনা যাচ্ছে, আরও কয়েকজন নেতা বহিষ্কৃত হবেন। তবে নির্বাচনের আগমুহূর্তে দল থেকে তাদের বহিষ্কার না করার কৌশল অবলম্বন করা উচিত ছিল। এভাবে বহিষ্কার করায় এখন বহিষ্কৃতরা উঠেপড়ে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের প্রার্থীর বিরুদ্ধে প্রচারণা চালাচ্ছে। এতে ভোটের মাঠে বিএনপি জোটের প্রার্থীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
তবে, বিএনপির সিংহভাগ নেতা-কর্মী জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের প্রার্থীর পক্ষে আছেন বলে দাবি করেছেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক। তিনি বলেন, ‘মামুনুর রশীদের পক্ষে বিএনপির কিছু নেতা ছিলেন, তাঁরা বহিষ্কৃত হয়েছেন। বিএনপির আরও কয়েকজন তাঁর সঙ্গে আছেন। এর বাইরে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাসহ বড় অংশই আমার সঙ্গে আছেন। সাধারণ ভোটারেরাও আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। জয়ের ব্যাপারে আমি আশাবাদী, ইনশাআল্লাহ।’
অন্যদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী মামুনুর রশীদ বলেন, ‘বিএনপির তৃণমূলের কর্মী-সমর্থক এবং সাধারণ ভোটাররা আমাকে প্রার্থী হতে উৎসাহিত করেছেন। সবার সমর্থন নিয়ে প্রার্থী হয়েছি। আমার জয় হবে ইনশাআল্লাহ।’
জানা যায়, স্বাধীনতার পর আসনটিতে চারবার আওয়ামী লীগ, তিনবার জাতীয় পার্টি ও দু’বার স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হন। এ ছাড়া বিএনপি, খেলাফত মজলিস ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী একবার করে জয়ী হয়েছেন। সর্বশেষ দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আল্লামা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ফুলতলী পীর ছাহেবের ছোট ছেলে মাওলানা হুছামুদ্দীন চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জয়ী হন।
এ আসনে আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলাহ (রহ.) প্রতিষ্ঠিত আনজুমানে আল ইসলাহের অনেক ভক্ত ও মুরিদ আছেন। ফুলতলী অনুসারীদের সিলেট-৫ আসনে একটা ভোটব্যাংক আছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুলতলী ঘরানার কেউ প্রার্থী হননি। তাই ফুলতলী অনুসারীদের ভোট এবার কার পক্ষে যাবে, এটা একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। অনেকের ধারণা ফুলতলী ঘরানার ‘ভোটব্যাংক’ জয়-পরাজয় নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে।
এদিকে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় জানিয়েছে, সিলেট-৫ আসনে মোট ভোটার ৪ লাখ ২৮ হাজার ৭৪৬ জন। এ ছাড়া পোস্টাল ভোটের জন্য নিবন্ধন করেছেন ৭ হাজার ৯১১ জন ভোটার।
Leave a comment