ক্রমাগত বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০৫০ সাল নাগাদ বিশ্বের সবচেয়ে চরম তাপপ্রবণ ছয়টি দেশের একটি হবে বাংলাদেশ—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন এক গবেষণা। গবেষণায় বলা হয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির এই প্রবণতা শুধু পরিবেশ নয়, বরং মানুষের জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করবে।
অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণাটি ২৬ জানুয়ারি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার সাসটেইনেবিলিটি’-তে প্রকাশিত হয়। এতে বলা হয়েছে, বর্তমান হারে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বছরের মধ্যে চরম তাপের মধ্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, যদি শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়ে, তাহলে এই শতাব্দীর মাঝামাঝি বিশ্বের প্রায় ৪১ শতাংশ মানুষ—অর্থাৎ প্রায় ৩ দশমিক ৭৯ বিলিয়ন মানুষ—চরম তাপপ্রবাহের মধ্যে বসবাস করবে। যেখানে ২০১০ সালে এ হার ছিল ২৩ শতাংশ বা প্রায় ১ দশমিক ৫৪ বিলিয়ন মানুষ।
গবেষণায় উচ্চ রেজ্যুলুশনের জলবায়ু ও জনসংখ্যা মডেলের সঙ্গে ‘কুলিং ডিগ্রি ডেজ’ বা সিডিডি সূচক ব্যবহার করে তাপপ্রবাহের ঝুঁকি নিরূপণ করা হয়েছে। বার্ষিক ৩ হাজার সিডিডির বেশি কুলিং প্রয়োজন হয়—এমন অঞ্চলগুলোকে গবেষকরা ‘চরম তাপপ্রবণ’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই সূচক মূলত বোঝায়, নিরাপদ ও সহনীয় অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা বজায় রাখতে কতটা শীতলীকরণ প্রয়োজন।
এই বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চরম তাপে সবচেয়ে বেশি মানুষের বসবাস রয়েছে ভারত, নাইজেরিয়া, ইন্দোনেশিয়া, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনে। গবেষণার প্রধান লেখক ড. জেসাস লিজানা বলেন, জাতীয় গড় তাপমাত্রা অনেক সময় প্রকৃত ঝুঁকিকে আড়াল করে। বাংলাদেশে বাস্তবে অধিকাংশ মানুষ এমন এলাকায় বসবাস করেন, যেখানে বার্ষিক কুলিং চাহিদা ৩ হাজার সিডিডির বেশি। এর অর্থ হলো দীর্ঘস্থায়ী ও বিপজ্জনক তাপের সংস্পর্শ, যা মানুষের স্বাস্থ্য, কর্মক্ষমতা ও উৎপাদনশীলতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।
গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল দেশ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও বন্যার ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনা হলেও চরম তাপ একটি তুলনামূলকভাবে ‘অদৃশ্য’ কিন্তু সমানভাবে প্রাণঘাতী হুমকি হিসেবে দ্রুত সামনে আসছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাপপ্রবাহ বৃদ্ধির ফলে হিটস্ট্রোক, হৃদ্রোগজনিত চাপ ও কিডনি রোগের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়, যা সবচেয়ে বেশি ভোগায় বয়স্ক, শিশু ও স্বল্প আয়ের মানুষদের—যাদের শীতলীকরণ সুবিধা সীমিত।
অক্সফোর্ড নেতৃত্বাধীন এই গবেষণায় আরও দেখা গেছে, উষ্ণ ও উপ-উষ্ণ অঞ্চলের নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে শীতলীকরণের চাহিদা দ্রুত বাড়বে। বিপরীতে, উন্নত উত্তরাঞ্চলীয় দেশগুলোতে শীতের তাপমাত্রা বাড়ার ফলে গরম রাখার চাহিদা কমতে পারে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, চরম তাপপ্রবণ দেশগুলোতে অতিরিক্ত শীতলীকরণ ব্যবস্থা যদি জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর হয়, তাহলে তা ‘কুলিং ট্র্যাপ’ তৈরি করে জলবায়ু সংকটকে আরও ত্বরান্বিত করতে পারে।
গবেষণার উপসংহারে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন যদি শিল্প-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি সীমাবদ্ধ রাখা যায়, তাহলে প্রাণঘাতী তাপের ঝুঁকিতে থাকা মানুষের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব। তবে সে সুযোগ দ্রুত সংকুচিত হয়ে আসছে বলেও সতর্ক করেছেন বিজ্ঞানীরা।

Leave a comment