একদিকে মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান সামরিক ব্যয়, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক পুনর্গঠন—এই দ্বিমুখী চাপে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় ঋণের বোঝা ইতিহাসের সব রেকর্ড ভেঙে ৩৯ ট্রিলিয়ন (৩৯ লাখ কোটি) ডলারের ভয়াবহ মাইলফলক স্পর্শ করেছে। গত বুধবার (১৮ মার্চ) দেশটির ট্রেজারি বিভাগ এই উদ্বোজনক তথ্য প্রকাশ করেছে, যা প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
সরকারি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মাত্র সাত মাসের ব্যবধানে যুক্তরাষ্ট্রের ঋণ ২ ট্রিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে। পাঁচ মাস আগে এই ঋণের পরিমাণ ছিল ৩৮ ট্রিলিয়ন এবং তার মাত্র দুই মাস আগে ছিল ৩৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বিশ্লেষকদের মতে, ব্যাপক কর ছাড়, কঠোর অভিবাসন আইন বাস্তবায়নের খরচ এবং বিশেষ করে ইরান যুদ্ধের জন্য প্রতিরক্ষা খাতে অস্বাভাবিক বরাদ্দ এই ঋণের পাহাড় তৈরিতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে।
গভর্নমেন্ট অ্যাকাউন্টেবিলিটি অফিস (জিএও) এক সতর্কবার্তায় জানিয়েছে, ঋণের এই ঊর্ধ্বগতি সাধারণ মার্কিন নাগরিকদের দৈনন্দিন জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। এর ফলে মর্টগেজ ও গাড়ি কেনার ঋণের সুদ বৃদ্ধি পাবে, ব্যবসায়িক বিনিয়োগ সংকুচিত হবে এবং সাধারণ মানুষের মজুরি হ্রাসের পাশাপাশি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। পিটার জি পিটারসন ফাউন্ডেশনের সিইও মাইকেল পিটারসন এই পরিস্থিতিকে ‘টেকসই অর্থনীতির পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছেন।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা হয়ে দাঁড়িয়েছে ইরান যুদ্ধ। হোয়াইট হাউসের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা কেভিন হ্যাসেট জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় যুক্তরাষ্ট্রের খরচ ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার ছাড়িয়ে গেছে। যুদ্ধের স্থায়িত্ব ও এর চূড়ান্ত ব্যয় নিয়ে এখনও কোনো স্পষ্ট ধারণা দিতে পারেনি প্রশাসন।
তবে ঋণের পরিমাণ বাড়লেও ফেডারেল বাজেট ঘাটতি কমছে বলে দাবি করেছে হোয়াইট হাউস। মুখপাত্র কুশ দেশাই জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপের ফলে ২০২৫ অর্থবছরে ঘাটতি আগের বছরের তুলনায় ৪১ বিলিয়ন ডলার কমে ১ দশমিক ৭৮ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। সরকারি কর্মীর সংখ্যা রেকর্ড পরিমাণ হ্রাস, কল্যাণমূলক কর্মসূচিতে জালিয়াতি বন্ধ এবং কর আদায় বৃদ্ধির মাধ্যমে জিডিপির বিপরীতে ঋণের অনুপাত নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধের ব্যয় যদি এভাবে বাড়তে থাকে, তবে আগামী নির্বাচনের আগেই মার্কিন ঋণ ৪০ ট্রিলিয়ন ডলারের মনস্তাত্ত্বিক সীমা অতিক্রম করতে পারে। যুদ্ধের ময়দানের পাশাপাশি এখন নিজেদের ভেঙে পড়া অর্থনীতির স্থিতিশীলতা রক্ষার জন্যও ওয়াশিংটনকে লড়াই করতে হচ্ছে।
Leave a comment