মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে এক ভয়াবহ ও নজিরবিহীন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৯ মার্চ) ভোররাত থেকে প্রতিবেশী চার দেশ—সৌদি আরব, কাতার, কুয়েত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে একযোগে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে ইরান। ক্ষেপণাস্ত্র ও আত্মঘাতী ড্রোনের এই সমন্বিত আক্রমণে দেশগুলোর প্রধান তেল শোধনাগার ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া গেছে।
হামলার সবচেয়ে বড় শিকার হয়েছে কাতার। দেশটির বৃহত্তম শিল্পাঞ্চল ‘রাস লাফান ইন্ডাস্ট্রিয়াল সিটি’ লক্ষ্য করে একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ‘কাতার এনার্জি’ নিশ্চিত করেছে যে, বিশ্বের অন্যতম প্রধান এলএনজি উৎপাদন ও রপ্তানি কেন্দ্রটিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে তাদের গুরুত্বপূর্ণ ‘পার্ল জিটিএল’ স্থাপনাটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি।
সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দরে অবস্থিত ‘সৌদি আরামকো’র সামরেফ (SAMREF) তেল শোধনাগারে একটি ইরানি ড্রোন সরাসরি আঘাত হেনেছে। সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ড্রোনটি স্থাপনার ওপর আছড়ে পড়ায় অবকাঠামোগত ক্ষতি হয়েছে। এদিকে কুয়েতের মিনা আল-আহমাদি এবং মিনা আব্দুল্লাহ তেল শোধনাগারেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। কুয়েত পেট্রোলিয়াম করপোরেশন জানিয়েছে, মিনা আল-আহমাদিতে আগুন লাগলেও তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। দৈনিক ৭ লাখ ৩০ হাজার ব্যারেল উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এই কেন্দ্রটি মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রধান জ্বালানি উৎস।
আমিরাতের ‘বাব তেলক্ষেত্র’ এবং ‘হাবসান গ্যাস কমপ্লেক্স’ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে তেহরান। আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আকাশেই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে। তবে ধ্বংসাবশেষ পড়ে গ্যাস কমপ্লেক্স ও তেলক্ষেত্রের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। নিরাপত্তার খাতিরে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ হাবসান গ্যাস কমপ্লেক্সের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
আল-জাজিরা, বিবিসি ও গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, একযোগে চার দেশের জ্বালানি খাতে এই নজিরবিহীন হামলা বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সংঘাত কেবল আঞ্চলিক সীমায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং বিশ্ব অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী স্থবিরতা ডেকে আনতে পারে। আক্রান্ত দেশগুলো এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে ভবিষ্যতে কঠোর প্রতিরোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
সূত্র: আল–জাজিরা, দ্য গার্ডিয়ান, সিএনএন, বিবিসি
Leave a comment